বাংলাদেশ, বুধবার, ২৭ মে ২০২০

চট্টগ্রাম বন্দর দিয়ে অবাধে আসছে হোয়ে পাউডার: বিপণনে তদারকি নেই!

প্রকাশ: ২০১৯-০২-০৭ ১৯:৫৯:১৮ || আপডেট: ২০১৯-০২-০৯ ১৭:১৬:৪১

বাংলাধারা প্রতিবেদন »

বছরে আট হাজার টন হোয়ে পাউডার আমদানি হচ্ছে চট্টগ্রাম বন্দর দিয়ে । দুধ থেকে মাখন পণীর বা ছানা তোলার পরে যে পানি এবং অবশিষ্টাংশ (গাদ) পড়ে থাকে তা শুকনো করে এই পাউডার তৈরী হয় । এতে দুধের কোন উপাদান থাকেনা তাই উন্নত বিশ্বে এটা সরাসরি খাওয়াহয়না বরং খাদ্যপণ্য প্রস্তুত করতে ব্যবহার হয়। দেশে প্রস্তুতকৃত খাদ্য পণ্যে আমদানি হওয়া এই হোয়ে পাউডার এর উল্লেখও নেই সর্বত্র। ফলে কোথায় কি পরিমান এ উপাদানটি ব্যবহার হচ্ছে তার কোন তথ্য নেই কোন সংস্থার কাছে ।

জাতীয় রাজস্ব বোর্ডের (এনবিআর) হোয়ে পাউডার আমদানি সংক্রান্ত তথ্য প্রতিবেদন পর্যালোচনায় দেখা গেছে, চট্টগ্রাম বন্দর দিয়ে চার বছরে হোয়ে পাউডার আমদানি হয়েছে ৩৩ হাজার ২১৭ টন । ২০১৮ সালে একই কায়দায় চট্টগ্রাম বন্দর দিয়ে হোয়ে পাউডার আমদানি করা হয়। এর মধ্যে গত ২০১৭ সালে ৮ হাজার ৯৩৩ টন আমদানি হয়েছে । এর আগে ২০১৬ সালে ৭ হাজার ৩২৩ টন, ২০১৫ সালে ৮ হাজার ৩৬০ টন, ২০১৪ সালে ৮ হাজার ৬০৫ টন হোয়ে পাউডার আমদানি হয়েছে ।

আমদানি নথি পর্যালোচনায় দেখা গেছে, ২০১৭ সালে সবচেয়ে বেশি আড়াই হাজার টন হোয়ে পাউডার আমদানি করেছে আবুল খায়ের গ্রুপ।

এর পরপরই রয়েছে মেঘনা গ্রুপের অঙ্গপ্রতিষ্ঠান তাসনিম কনডেন্সড মিল্ক ২ হাজার ৩৪২ টন, পারটেক্স গ্রুপের অঙ্গ প্রতিষ্ঠান ড্যানিশ কনডেন্সড মিল্ক ১ হাজার ২০০ টন, এম এইচ কনজ্যুমারস প্রডাক্টস ৯০০ টন, সামান্নাজ কনডেন্সড মিল্ক ৬৯১ টন, নূর ডেইরি এন্ড ফুড প্রসেসিং ৪০০ টন, অলিম্পিক ইন্ডাস্ট্রিজ ৩২২ টন, ওমেগা কর্পোরেশন ২২৫ টন, ফয়সল ট্রেডিং কোম্পানি ১০০ টন, এম এইচ কনজ্যুমারস প্রোডাক্টস ৫০ টন, এনবি ডেইরি এন্ড কনজ্যুমারস প্রোডাক্টস ৫০ টন, মোস্তফা এন্টারপ্রাইজ ৫০ টন, রেদওয়ান ব্রাদার্স ২৫ টন, গোল্ডেন ট্রেডিং ২৫ টন, রাহাত কর্পোরেশন ২৫ টন, ঢাকা ট্রান্সপোর্ট এন্ড ট্রেডিং ১৬ টন এবং রোমানিয়া ফুড এন্ড বেভারেজ লিমিটেড আমদানি করেছে ৫ টন হোয়ে পাউডার।

চলতি বছরের গত দুই মাসেও (জানুয়ারি ও ফেব্রুয়ারি) সবচেয়ে বেশি ৩৮৫ টন হোয়ে পাউডার আমদানি করে শীর্ষে রয়েছে আবুল খায়ের গ্রুপে সহযোগী প্রতিষ্ঠান আবুল খায়ের মিল্ক প্রোডাক্টস লিমিটেড । একই সময়ে সামান্নাজ কনডেন্স মিল্ক ১০০ টন, মেঘনা গ্রুপের সহযোগী প্রতিষ্ঠান তাসনিম কনডেন্সড মিল্ক লিমিটেড ৪২ টন এবং মেসার্স তালহা এন্টারপ্রাইজ, ওমেগা কর্পোরেশন ও রেদওয়ান ব্রাদার্স যথাক্রমে ২৫ টন করে হোয়ে পাউডার আমদানি করেছে।

দুদক এর মহাপরিচালক ও মিল্ক ভিটা এর সাবেক ব্যবস্থাপনা পরিচালক মোহাম্মাদ মুনীর চৌধুরী বলেন, ‘খাদ্যমান রক্ষা আমাদের সবচেয়ে বড় চ্যালেঞ্জ। বিশ্বের কোটি কোটি শিশু অপুষ্টির কারণে কৃশকায়ত্ব ও খর্বত্বের শিকার হচ্ছে, যার অন্যতম কারণ পর্যাপ্ত দুধের অভাব। বিশ্বজুড়ে এখন দুধের মাধ্যমে অপুষ্টির সংকট মোকাবিলার কথা উচ্চারিত হচ্ছে।

তাই সংশ্লিষ্ট নিয়ন্ত্রক সংস্থাগুলোর এ খাদ্যটির বিপণন ব্যবস্থায় প্রতারণা ও মান নিয়ন্ত্রনে কঠোর পর্যবেক্ষণ জরুরী। দেশে নিরাপদ খাদ্য নিশ্চিত করতে কাজ করছে বাংলাদেশ নিরাপদ খাদ্য কর্তৃপক্ষ । সংস্থাটির তথ্য মতে, হোয়ে পাউডার ক্ষতিকারক বা ভেজাল নয় তবে মূল্যের ও মানের দিক থেকে অনেক নিন্মমানের ।

দেশে আমদানি করা এই প্রচুর পরিমাণে হোয়ে পাউডার দেশের অভ্যন্তরে খুঁজে পাওয়া যাচ্ছে না। কোন খাদ্য পণ্যের গায়ে উপাদান হিসেবে হোয়ে পাউডার এর উল্লেখ নেই । পণ্যের মোড়কে উল্লেখ না করে যদি এই হোয়ে পাউডার ফুল ক্রীম মিল্ক পাউডার বা স্কিম মিল্ক কিংবা অন্য কোন খাদ্য প্রস্তুত প্রণালীতে ব্যবহার হয় এটা ক্রেতার সাথে বড় ধরনের প্রতারণা । এটা নিরাপদ খাদ্য আইন, বিএসটিআই এবং ভোক্তা অধিকার সংরক্ষণ আইন অনুযায়ী শাস্তিযোগ্য অপরাধ।

বাংলাদেশ নিরাপদ খাদ্য কর্তৃপক্ষের সদস্য মাহবুব কবির এ প্রসঙ্গে বলেন, তরল দুধ তৈরীর পর উচ্ছিষ্ট হিসেবে থেকে যায় সেটাই হোয়ে পাউডার । এটা মানের দিক থেকে অত্যন্ত নিন্মমানের । আমাদের দেশে প্রচুর পরিমানে হোয়ে পাউডার আমদানি হলেও কোন খাদ্য পণ্যের গায়ে উপাদান হিসেবে এর উল্লেখ নেই । আইন অনুযায়ী কোথায় কি পণ্য কি পরিমানে ব্যবহার হচ্ছে তা জানতে উৎপাদক ব্যবসায়িরা বাধ্য।

আমাদের দেশে ঢুকে কারখানায় এবং পণ্যের গায়ে এটি স্কিম মিল্ক পাউডার বা মিল্ক পাউডার বা দুগ্ধজাত হিসেবে রুপান্তরিত হয়ে যাচ্ছে কিনা সেটা খতিয়ে দেখা হবে। হোয়ে পাউডারকে মিল্ক পাউডার বা দুগ্ধজাত উপাদান হিসেবে চালান বা প্রকাশ প্রমাণিত হলে সংশ্লিষ্টদের শাস্তির মুখোমুখি হতে হবে ।

ক্যাব কেন্দ্রিয় কার্য নির্বাহী কমিটির ভাইস প্রেসিডেন্ট এস এম নাজের হোসাইন বলেন, বিদেশ থেকে অত্যন্ত নিন্মমানের ও মেয়াদোত্তীর্ণ গুঁড়ো দুধ এনে চটকদার বিজ্ঞাপন দিয়ে বাজারজাতের নজির রয়েছে আমাদের দেশে । সেসব দুধই খাওয়ানো হচ্ছে শিশুদের।

একইসঙ্গে বস্তায় করে বিদেশ থেকে আনা হচ্ছে গুড়ো দুধ ও হোয়ে পাউডার। চটকদার বিজ্ঞাপনের ফাঁদে পড়ে এসব খাবার কিনে অভিভাবকরা তাদের বাচ্চাদের খাওয়াচ্ছেন পুষ্টির জন্য। কিন্তু প্রকৃতপক্ষে এসব খাবারে শিশুদের শরীরের পুষ্টির চাহিদা পূরণ তো হচ্ছেই না, বরং ক্ষতি হচ্ছে।

বাংলাধারা/এনএস/এম/বি