বাংলাদেশ, মঙ্গলবার, ২৬ মে ২০২০

সুরুজ আলীর রইলো না আর কেউ

প্রকাশ: ২০১৯-০২-১৭ ১৬:২৫:২১ || আপডেট: ২০১৯-০২-১৭ ১৬:২৬:২১

তারেক মাহমুদ »

সুরুজ আলী, ৬০ বছরের বৃদ্ধ। বাকলিয়া থানার চাক্তাই এলাকার ভেড়া মার্কেট সংলগ্ন এলাকায় ছোট্ট একটি চায়ের দোকান চালিয়ে সংসার চালাতেন তিনি। নিকটস্থ একটি বস্তিতে স্ত্রী রহিমা (৫০), কণ্যা নাজমা(১৬), পুত্র জাকির হোসেন (৮) ও আরেক কণ্যা নাসরিন (৮) কে নিয়ে বসবাস করতেন তিনি।

নিত্যদিনের মত গতকালও সুরুজ আলী ছিলেন চায়ের দোকানে। এই দোকানে পালা করে বসতো তার পরিবারের হারানো স্বজনরা। সুরুজ আলীর দোকানে চা খেতে খেতে আড্ডা দিতেন এলাকার আবাল, বৃদ্ধ জনতা। তাই তার দোকানে ভীড় লেগেই থাকতো। রাত গভীর হতে লাগলো। সুরুজ আলী ব্যস্ত তার দোকানে আর স্বজনরা সারাদিনের হাড়ভাঙ্গা পরিশ্রমের পর দুচোখ জুড়াতে গেল বিছানায়। কে জানতো সুরুজ আলীর জীবনে এভাবে নেমে আসবে শোকের ছায়া, একসাথে হারাবেন বুকে আগলে রাখা পরিবারের সবাইকে! তারা তো জানতো না এই নিদ্রাই তাদের চিরনিদ্রায় শায়িত করবে।

দোকান থেকে চায়ের কাপের টুংটাং শব্দ আসছে, সুরুজ আলী ব্যস্ত। খবর এলো বস্তিতে আগুন লেগেছে। একবুক দুশ্চিন্তা নিয়ে বস্তির দিকে ছুটলেন তিনি। নিজের ঘরের গিয়ে দেখেন দাউ দাউ করে জ্বলছে আগুন। স্বজনরা কি ভেতরে নাকি বাইরে তাও বুঝে উঠতে পারছিলেন না তিনি। এদিক ওদিক হতভম্ব হয়ে ছুটতে লাগলেন তিনি। তার পরিবারের সন্ধান দিতে পারে নি কেউ। রাত পৌণে চারটায় ফায়ার সার্ভিস কর্মীরা এসে আগুন নিয়ন্ত্রণে আনার পর ভোরবেলা সুরুজ আলীর ঘর থেকে বেরিয়ে এল চারটি কঙ্কাল। পরিবারের চার সদস্যকে হারিয়ে আহাজারীতে বারবার মুর্ছা যাচ্ছিলেন সুরুজ আলী। স্বজন হারানোর বেদনায় সুরুজ আলী আজ নিস্তব্ধ, নির্বাক।

এদিকে, ওই বস্তিতে গার্মেন্টসকর্মী আয়েশা তার দুই সন্তান সোহাগ (১৯) ও মিতু (১১) কে নিয়ে বসবাস করতেন। সোহাগ একটি চায়ের দোকানে কাজ করতেন এবং মিতু লেখাপড়া করতেন। অগ্নিকান্ডে তারা সবাই নিহত হন।

স্বজন হারিয়ে কাঁদতে কাঁদতে হতাশাগ্রস্থ মমিন বলেন, আমি এখানে থাকি না। ঘটনার খবর শুনেই ছুটে এসে দেখি আমার স্বজনরা পুড়ে কঙ্কাল হয়ে আছে। চাক্তাই এলাকার ভেড়া মার্কেট সংলগ্ন বস্তিতে অগ্নিকান্ডে পুড়ে যাওয়া ২০০ টি বস্তিতে গার্মেন্টস কর্মী, চা দোকানদার, মাছ ব্যবসায়ী, কুলি, শ্রমিকসহ বিভিন্ন পেশার মানুষ বসবাস করতো। বস্তিতে বসবাসকারী মাছ বিক্রেতা জেসমিন বলেন, রাত ৩ টায় আগুন লাগে। ফায়ার সার্ভিস কর্মীরা রাত পৌণে চারটার দিকে আসে। তখন বস্তির অর্ধেক পুড়ে ছাই হয়ে যায়। এখানে স্থানীয় কেউ মারা যায় নি। সব বাইরের লোক।

স্থানীয়রা জানায়, ঘটনার সাথে সাথে ফায়ার সার্ভিসকে খবর পাঠানো হয়। কিন্তু এর আগে এই স্থান থেকে ফায়ার সার্ভিসকে ভুল তথ্য দিয়ে বিভ্রান্ত করা হয়েছিল। তাই ঘটনার সত্যতা যাচাই করে আসায় ফায়ার সার্ভিস কর্মীদের আসতে দেরি হয়েছে। বস্তির বিভিন্ন অংশ সাত্তার কলোনি, ফরিদ কলোনি- এরকম নামে পরিচিত ছিল।

ঘটনাস্থলে গিয়ে সহায়-সম্বল হারানো মানুষগুলোর সঙ্গে কথা বলে জানা গেছে, যে জায়গায় আগুনের সূত্রপাত হয়েছে, প্রকৃত বেড়া মার্কেট সংলগ্ন কলোনির অবস্থান এর থেকে আরও প্রায় এক কিলোমিটার দূরে। কর্ণফুলী নদীর তীরবর্তী মেরিন রোডের উত্তরে রাজাখালী খালের চর দখল করে ২০০০ সালের দিকে গড়ে তোলা হয় নতুন বস্তি। পুড়ে যাওয়া বস্তির বাসিন্দারা জানান, বস্তিতে ঘরপ্রতি ভাড়া ১০০০ টাকা থেকে ২০০০ টাকা পর্যন্ত আদায় করা হত। বিদ্যুতের সংযোগ ছিল। তবে গ্যাসের সংযোগ না থাকায় তারা সিলিন্ডার গ্যাস ব্যবহার করত।

স্থানীয়রা জানায়, বর্তমানে এই বস্তির নিয়ন্ত্রণ আছে নগরীর ৩৫ নম্বর বকশিরহাট ওয়ার্ড যুবলীগের সহ-সভাপতি আকতার ওরফে কসাই আকতারের নিয়ন্ত্রণে। তার সঙ্গে আছে স্থানীয়ভাবে প্রভাবশালী করিম নামে আরও একজন। তারা স্থানীয় সাত্তার, হেলাল, ফরিদ, বেলালসহ কয়েকজনকে এই বস্তির ভাড়াটিয়াদের নিয়ন্ত্রণের দায়িত্ব দিয়েছে। এরাই বস্তি থেকে প্রতিমাসে ভাড়া তোলে।

আগুনে পুড়ে মারা যাওয়া রহিমা আক্তারের ভাই মো.আকবর বলেন, দুই সপ্তাহ আগে আমাদের চলে যেতে বলা হয়েছিল। কিন্তু ঘরের মালিক এসে বলেন- তিনি হাইকোর্টে গিয়ে সব ঠিক করে আসবেন। উচ্ছেদ হবে না। তখন আমরা রয়ে যাই। অথচ অনেকেই চলে গেছে।

জেলা প্রশাসক ইলিয়াস হোসেন জানান, এ অগ্নিকাণ্ডের কারণ খতিয়ে দেখতে অতিরিক্ত জেলা ম্যাজিস্ট্রেটকে প্রধান করে চার সদস্যের একটি তদন্ত কমিটি করা হয়েছে। নিহতদের প্রত্যেকের দাফনের জন্য জেলা প্রশাসনের পক্ষ থেকে প্রাথমিকভাবে ২০ হাজার টাকা করে সহায়তা দেয়া হবে বলে জানান তিনি।

চট্টগ্রাম ফায়ার সার্ভিসের উপ-সহকারী পরিচালক জসিম উদ্দিন বাংলাধারা ডটকমকে জানান, ফায়ার সার্ভিসের লামার বাজার, নন্দনকানন, আগ্রাবাদ ও চন্দনপুরাসহ মোট চারটি ইউনিটের ১০টি গাড়ি ভোর সোয়া ৪টার দিকে আগুন নেভাতে সক্ষম হয়। ঘটনাস্থল থেকে ৯ জনের লাশ উদ্ধার করা হয়েছে। তাদের মধ্যে ৭ জনের নাম জানা গেছে।

বাংলাধারা/এনএস/এমআর/টিএম/বি

ট্যাগ :