বাংলাদেশ, রোববার, ২০ অক্টোবর ২০১৯

দেশের প্রথম দ্বিতল নগরী হতে যাচ্ছে চট্টগ্রাম

প্রকাশ: ২০১৯-০২-২৬ ১৯:১৫:১৭ || আপডেট: ২০১৯-০২-২৭ ১৭:০০:৪৬

তৌফিক রাহাত »

ভৌগোলিকভাবে চট্টগ্রামের মতো বৈচিত্রময় শহর অদ্বিতীয়। পাহাড়,নদী, সমুদ্র এ শহরকে করেছে অপরূপ। তবে নগরের বুক চিরে চলে যাওয়া বহদ্দারহাট থেকে শাহ আমানত আন্তর্জাতিক বিমানবন্দর পর্যন্ত ২৩ কিলোমিটার দীর্ঘ এ মূল সড়কটি নগরকে করেছে অনন্য। এ সড়কটিকে বলা হয় চ্ট্টগ্রামের ধমনি বা লাইফ লাইন। নগরীর প্রায় সব সড়ক এসে মিশেছে এই মহাসড়কে। তাই এ সড়ক থেকে যাওয়া যায় নগরীর যে কোন প্রান্তে।

সড়কের বহদ্দারহাট থেকে লালখান বাজার পর্যন্ত উড়াল সড়ক নির্মাণ করা হয়েছিল আগেই। সম্প্রতি প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা লালখান বাজার থেকে বিমান বন্দর পর্যন্ত ১৬ দশমিক ৫ কিলোমিটার এলিভেটেট এক্সপ্রেসওয়ের নির্মাণ কাজ উদ্বোধন করেছেন। এ এক্সপ্রেসওয়ের নির্মাণ কাজ শেষ হলে চট্টগ্রাম সত্যিই পরিণত হবে দ্বিতল সড়কের নগরীতে।

বিশেষজ্ঞদের ধারণা, এলিভেটেড এক্সপ্রেসওয়ের কাজ শেষ হলে নগরীর একপ্রান্ত থেকে আরেক প্রান্তে দ্রুত যাওয়া যাবে। মাত্র ৩০ মিনিটে বহদ্দারহাট থেকে শাহ আমানত বিমানবন্দর যাওয়া যাবে। সেই সাথে অনেকাংশে হ্রাস পাবে নগরীর যানজট। পাশাপাশি চট্টগ্রামে প্রচুর পরিমাণে বাড়বে দেশী ও বিদেশী বিনিয়োগ।

এলিভেটেড এক্সপ্রেসওয়ে

যানজট হ্রাস এবং বিমানবন্দরে যাতায়াতের পথ সুগম করতে ১৬ দশমিক ৫ কিলোমিটার দৈর্ঘ্যের এলিভেটেড এক্সপ্রেসওয়ে নির্মাণ প্রকল্প হাতে নেয় চট্টগ্রাম উন্নয়ন কর্তৃপক্ষ (সিডিএ)। চট্টগ্রাম শহরের লালখান বাজার হতে শাহ আমানত বিমানবন্দর পর্যন্ত দেশের বৃহত্তম চট্টগ্রামের এ এলিভেটেড এক্সপ্রেসওয়ে নির্মাণ প্রকল্পটি ২০১৭ সালের ১১ জুলাই একনেকে অনুমোদন পায়। তিন হাজার ২৫০ কোটি ৮৪ লাখ টাকা ব্যয়ের এই মেগা প্রকল্পের নির্মাণকাজ গত ২৪ ফেব্রুয়ারি আনুষ্ঠানিকভাবে উদ্বোধন করেন প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা।

ছবি: এ হোসেন

চার লেনের এ এক্সপ্রেসওয়ের নির্মাণকাজ হবে ছয়টি ভাগে। প্রধানমন্ত্রী উদ্বোধনের পর প্রথমে নগরীর সিমেন্ট ক্রসিং থেকে কাটগড় , তারপর কাটগড় থেকে পতেঙ্গা সমুদ্র সৈকত, সিমেন্ট ক্রসিং থেকে সল্টগোলা ক্রসিং, সল্টগোলা থেকে বারিকবিল্ডিং, বারিকবিল্ডিং থেকে দেওয়ানহাট এবং দেওয়ানহাট থেকে লালখানবাজার অংশের কাজ ধাপে ধাপে সম্পন্ন হবে। এক্সপ্রেসওয়ের ৯টি অংশে যাত্রী ওঠানামার ব্যবস্থা থাকবে। এলিভেটেড এক্সপ্রেসওয়ের নয়টি পয়েন্টে ২৪টি র‌্যাম্প থাকবে।

বাংলাদেশ সরকারের নিজস্ব অর্থায়নে এই মেগা প্রকল্পের নির্মাণকাল ধরা হয়েছে চার বছর। প্রকল্পটির কাজ ২০২২ সালে শেষ হওয়ার কথা রয়েছে ।

সিডিএ’র নির্বাহী প্রকৌশলী ও এলিভেটেট এক্সপ্রেসওয়ের প্রকল্পের পরিচালক মোহাম্মদ মাহফুজুর রহমান বাংলাধারাকে জানান, নিরবিচ্ছিন্ন যোগাযোগ নিশ্চিত করতে মূল সড়কের উপর বহদ্দারহাট থেকে লালখান বাজার পযন্ত ফ্লাইওভার নির্মাণ কাজ শেষ হয়েছে। বর্তমানে এ অংশে যানজট হয় না বললেই চলে। বর্তমানে আগ্রাবাদ,বন্দর, কাস্টমস, প্রি-পোর্ট, এলাকায় যে যানজট হয় তাতে বিমান বন্দরগামী অনেক যাত্রী তাদের ফ্লাইট মিস করে। এ জন্য ডেটিকেটেট রোড নির্মাণের প্রয়োজনীয়তা জরুরি হয়ে পড়ে। নির্মীয়মাণ এলিভেটেট এক্সপ্রেসওয়ের প্রকল্প কাজ শেষ হলে এ এলাকার যানজট অনেকাংশে হ্রাস পাবে। তাছাড়া বিমান বন্দরগামী বিভিন্ন যান খুব দ্রুত চলাচল করতে পারবে। এতে ফ্লাইট মিসসহ যাবতীয় ক্ষতি অনেক কমে যাবে।

আখতারুজ্জামান ফ্লাইওভার ( মুরাদপুর-লালখান বাজার ফ্লাইওভার )

চট্টগ্রাম মহানগরীর অসহনীয় যানজট কমাতে মুরাদপুর থেকে লালখান বাজার পর্যন্ত ৫ দশমিক ২ কিলোমিটার দৈর্ঘ্য ও ৫৪ ফুট প্রস্থবিশিষ্ট চার লেনের আখতারুজ্জামান ফ্লাইওভারের ভিত্তিপ্রস্তর স্থাপন করা হয় ২০১৩ সালের ১২ অক্টোবর। প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা চট্টগ্রামের বৃহত্তম ফ্লাইওভারটির ভিত্তিপ্রস্তর স্থাপন করেন।

২০১৪ সালের ১২ নভেম্বর প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা মূল অবকাঠামো তৈরিতে ৪৬২ কোটি ২৯ লাখ টাকা ব্যয়ে ফ্লাইওভারটির নির্মাণ কাজের উদ্বোধন করেন। ২০১৫ সালের মার্চে মূল নির্মাণকাজ শুরু হয়েছিল । ২০১৭ সালের ১৭ ই জুন একাংশ খুলে দেয়া হয়। একই বছর পবিত্র ঈদুল আযহার আগেই পুরোপুরি চলাচলের জন্য খুলে দেওয়া হয়।

পরবর্তীতে ফ্লাইওভারের দুই নম্বর গেইট এলাকায় নতুন একটি লুপ এবং জিইসি মোড় এলাকায় র‌্যাম্প যোগ করা হয় । এতে ফ্লাইওভারটির মোট দৈর্ঘ্য দাঁড়ায় ৬.৫ কি.মি। প্রকল্প ব্যয়ও বেড়ে হয় ৬৯৮ কোটি টাকা। যার মধ্যে মূল অবকাঠামো তৈরিতে ব্যয় হয় ৪৫০ কোটি টাকা এবং র‌্যাম্প ও লুপ তৈরির কাজে ব্যয় করা হয় ২৪৬ কোটি টাকা।

এম এ মান্নান ফ্লাইওভার ( বহদ্দারহাট ফ্লাইওভার)

যানজট নিরসনে ২০০৮ সালে চট্টগ্রাম উন্নয়ন কর্তৃপক্ষ (চউক) শুলকবহর থেকে বহদ্দারহাট হয়ে আরাকান সড়ক এবং শাহ আমানত সেতুর সংযোগ সড়কের উপর ‘ওয়াই’ আকৃতির চট্টগ্রামে প্রথম ফ্লাইওভার নির্মাণের নকশা প্রণয়ন করে। পরে এ নকশা পরিবর্তন করে শুধু শুলকবহর থেকে বহদ্দারহাট হয়ে এক কিলোমিটার পযন্ত ফ্লাইওভার করার সিদ্ধান্ত নেয় সিডিএ। সিডিএ’র নিজস্ব অর্থায়নে ১০৬ কোটি টাকা ব্যয়ে ১ দশমিক ৩৩ কিলোমিটার দীর্ঘ ফ্লাইওভার নির্মাণ করে। ২০১০ সালের জানুয়ারিতে প্রধানমন্ত্রী ফ্লাইওভার নির্মাণ কাজের ভিত্তিপ্রস্তর স্থাপন করেন। ঐ বছরের ডিসেম্বরে ফ্লাইওভার নির্মাণ কাজ শুরু হয়। নির্মাণ কাজ শেষে ২০১৩ সালের ১২ অক্টোবর ফ্লাইওভারের উদ্বোধন করেন প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা।

২০১৬ সালে ডিসেম্বরে আরাকান সড়কমুখী র‌্যাম্প নির্মাণের উদ্যোগ নেয় সিডিএ। ৩২৬ মিটার দীর্ঘ ও ৬ দশমিক ৭ মিটার চওড়া র‌্যাম্প ২০১৭ সালের ১৬ ডিসেম্বর যান চলাচলের জন্য উন্মুক্ত করে দেওয়া হয়। এতে যানজটের পরিমান অনেক কমে যায় বহদ্দারহাট এলাকায় । সিডিএ’র নিজস্ব অর্থায়ণে মোট ১৪৭ কোটি টাকা ব্যয়ে এ ফ্লাইওভার নির্মাণ করা হয়।

বাংলাধারা/এনএস/এমআর/টিআর/বি

ট্যাগ :