বাংলাদেশ, শুক্রবার, ২৩ আগস্ট ২০১৯

গ্রাহকদের সাথে জিপিএইচ ইস্পাতের প্রতারণা

প্রকাশ: ২০১৯-০৩-২৭ ১৯:৪২:০০ || আপডেট: ২০১৯-০৩-২৭ ১৯:৪২:০৭

মিজানুর রহমান ইউসুফ »

চট্টগ্রামের সীতাকুন্ডে অবস্থিত জিপিএইচ ইস্পাত দেশের সেরা ইস্পাত কারখানাগুলোর মধ্যে অন্যতম। যাদের তৈরি এমএস বার বা রড বেশ আস্থার সাথে ব্যবহৃত হয় সরকারি ও বেসরকারি বড় বড় নির্মাণ প্রকল্পে। তবে গত প্রায় দুই বছর ধরে জিপিএইচ কর্তৃপক্ষ গ্রাহকদের সাথে চরম প্রতারণা করে আসছে বলে অভিযোগ রয়েছে।

এই স্বধামধন্য ইস্পাত কারখানার মালিকরা অন্য দুটি অখ্যাত ইস্পাত কারখানায় এমএস বার বানিয়ে তাতে নিজেদের লোগো লাগিয়ে বাজারজাত করছে। এতে বাজার থেকে জিপিএইচ ইস্পাতের লোগো লাগানো নিম্নমানের রড কিনে প্রতারিত হচ্ছেন গ্রাহকরা। জিপিএইচের গ্রাহকদের মধ্যে যেমন রয়েছে সরকারের বিভিন্ন প্রতিষ্ঠান, তেমনি রয়েছে দেশের নামকরা অনেক ডেভেলপার কোম্পানি। এসব প্রতিষ্ঠানের কেউই জিপিএইচের এই প্রতারণা সম্বন্ধে অবগত নয়।

ছবি: নগরীর নাসিরাবাদ এলাকায় সালেহ্ স্টীল থেকে জিপিএইচের নিজস্ব গাড়িতে তোলা হচ্ছে রড

জিপিএইচ ইস্পাতের এই প্রতারণার বিষয়ে জানতে চাইলে চট্টগ্রাম উন্নয়ন কর্তৃপক্ষের (সিডিএ) নির্বাহী প্রকৌশলী মাহফুজুর রহমান বাংলাধারাকে বলেন, অন্য কারখানা থেকে রড বানাতে গেলে গুণগত মান ঠিক রাখা কখনোই সম্ভব না। কেউ যদি এভাবে অন্য কারখানা থেকে রড বানিয়ে নিজেদের লোগো ব্যবহার করে বাজারজাত করে থাকে, তা হচ্ছে গ্রাহকের সাথে চরম প্রতারণা। এ প্রতারণার বিরুদ্ধে অবিলম্বে ব্যবস্থা নেয়া জরুরী বলে মনে করেন এ প্রকৌশলী।

তিনি আরও বলেন, এরকম কিছু অভিযোগ পাওয়ার পর আমরা কোন প্রতিষ্ঠান থেকে রড সরবরাহ নেয়ার সময় কঠোর নজরদারি এবং প্রতি ব্যাচ নিজেদের ল্যাবে পরীক্ষা করে তারপর সরবরাহ নিয়ে থাকি।

রিহ্যাব চট্টগ্রামের প্রেস অ্যান্ড মিডিয়া কমিটির আহ্বায়ক এ এস এম আবদুল গাফফার মিয়াজী বাংলাধারাকে বলেন, ডেভেলপাররা রডের সরবরাহ নেয়ার সময় প্রতিবার পরীক্ষা করে নেয়ার সুযোগ থাকে না।

ছবি: রড বোঝাইয়ের পর জিপিএইচের নিজস্ব গাড়ি বের হচ্ছে সালেহ্ স্টীল থেকে

আমরা বড় ব্র্যান্ডগুলোর গুণগত মানের উপর আস্থা রেখে তাদের রডগুলো দিয়ে নির্মাণ কাজ চালাই। কেউ যদি এই আস্থার সুযোগ নিয়ে নিম্নমানের কোন কারখানা থেকে রড বানিয়ে তাদের নিজেদের নামে বিক্রি করে তা কখনও গ্রহণযোগ্য নয়।

বাংলাদেশ স্ট্যান্ডার্ডস অ্যান্ড টেস্টিং ইনস্টিটিউশনের (বিএসটিআই) উপ-পরিচালক নুরুল আমিন বাংলাধারাকে বলেন, কোন ইস্পাত কারখানা কোন কারণে অন্য কোন কারখানা থেকে রড বানাতে চাইলে তা বিএসটিআইয়ের তত্ত্বাবধানে নতুন করে পরীক্ষা করে একটি লাইসেন্স নিতে হয়। পরীক্ষা করে গুণগত মান যদি মূল কারখানার গুণগত মানের সমপর্যায়ে থাকে তবেই বিএসটিআই এই অনুমতি দেয়।

নুরুল আমিন আরও বলেন, কেউ যদি অনুমতি না নিয়ে এভাবে অন্য কারখানা থেকে রড বানিয়ে নিজেদের বলে বাজারজাত করে থাকে, তা দন্ডনীয় অপরাধ। গ্রাহকদের সাথে এহেন প্রতারণা এবং আইন ভাঙ্গার জন্য  জিপিএইচের বিরুদ্ধে শীঘ্রই ব্যবস্থা নেয়া হবে বলে জানান বিএসটিআইয়ের এই কর্মকর্তা।

কনজ্যুমারস এসোসিয়েশন অব বাংলাদেশের (ক্যাব) চট্টগ্রাম অঞ্চলের সভাপতি নাজের হোসাইন বাংলাধারাকে জানান, অন্যের পণ্য নিজের লোগো লাগিয়ে বাজারজাত করা শুধুই প্রতারণাই না, শাস্তিযোগ্য অপরাধও বটে। জিপিএইচের মত বড় ব্র্যান্ড যদি এ প্রতারণা করে থাকে, তবে তারা দেশীয় ইস্পাতের বাজারটাকেই ক্ষতিগ্রস্থ করছে। এমন প্রতারণা চলতে থাকলে ক্রেতারা দেশীয় এ শিল্পের প্রতি আস্থা হারিয়ে আবার বিদেশমুখী হতে পারে বলে আশঙ্কা প্রকাশ করেছেন ক্যাব সভাপতি। বিএসটিআইয়ের এসব ব্যাপারে নজরদারি আরও বাড়ানো উচিত বলে মনে করেন তিনি।

ছবি: রড বোঝাইয়ের পর সালেহ্ স্টীল মিলের সামনে দাঁড়িয়ে আছে জিপিএইচের গাড়ি

প্রতারণার এই অভিযোগের বিষয়ে জানতে চাইলে জিপিএইচ ইস্পাতের এডিশনাল ম্যানেজিং ডিরেক্টর (এএমডি) মো. আলমাস শিমুল বাংলাধারার কাছে স্বীকার করে বলেন, সালেহ স্টীল এবং সীমা স্টীল থেকে আমাদের প্রকৌশলীদের তত্ত্বাবধানে গুণগত মান ঠিক রেখে আমরা রড বানিয়ে নিই। উৎপাদন সক্ষমতার চাইতে চাহিদা বেশি হওয়ায় গ্রাহকদের চাহিদা মেটাতে আমাদের অতিরিক্ত উৎপাদন অন্য কোম্পানি থেকে করিয়ে নিতে হচ্ছে।

তবে তারা গ্রাহকদের সাথে কোন প্রতারণা করছেন না বলে দাবি করে আলমাস শিমুল বলেন, যেহেতু আমরা গুণগত মান ঠিক রাখছি, তাই প্রতারণার কোন অবকাশ নেই।

বাংলাধারা/এমআর/এফএস