বাংলাদেশ, মঙ্গলবার, ২২ অক্টোবর ২০১৯

এবি বাকী- হারিয়ে যাওয়া একটি নক্ষত্র

প্রকাশ: ২০১৯-০৪-২৪ ১৩:২১:২৩ || আপডেট: ২০১৯-০৪-২৪ ১৩:২২:০৫

মোঃ আশিকুর রহমান »

মাঝে মাঝে কিছু পছন্দ-অপছন্দের বিষয় নিয়ে আমি লেখালিখি করি। কিন্তু এবার লেখাটা লিখতে যতটা বেগ পেতে হয়েছে, পূর্বে তা কখনোই হয় নি। কোথা থেকে যে শুরু করব আর কোথায় নিয়ে শেষ করব, তা ঠিক বুঝে উঠতে পারছিলাম না। আপন কারো বিয়োগে আবেগ সংবরণ করে লেখাটা যে কতটা কষ্টের তা যেন এই প্রথম অনুধাবন করলাম।
আবদুল্লাহ বিন বাকী (নোবেল) আমার কাছে ঠিক তেমনি একটি নাম। সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে তিনি এবি বাকী নামে পরিচিত।

পরিচয়ের শুরুটা ২০০৬ এর শুরু বা মাঝামাঝির দিকে। আমি তখন চট্টগ্রাম জেলা শিল্পকলা একাডেমীর সমীকরণ থিয়েটারের সদ্য যুক্ত হওয়া নবাগত নার্ট্যকর্মী। তখন স্বপন ভট্টাচার্যের রচনা ও নির্দেশনায় নাটক “সম্পর্কের আর্বতে”র মহড়া চলছে। মহড়ার মাঝামাঝিতে নতুন এক মুখ। মেধাবী, পরিশ্রমী এবং পটু এক নার্ট্যযোদ্ধার আর্বিভাব হল দলে – আবদুল্লাহ বিন বাকী (নোবেল)। বয়জোষ্ঠ্য নার্ট্যকর্মীদের জন্য বাকী আর আমাদের জন্য নোবেল। অন্য আট-দশজনের চেয়ে তিনি যে কিছুটা ব্যাতিক্রম তা আমাদের দলপতি আলোক মাহমুদ বুঝতে পারলেন। তাই তো খুব দ্রুত তাকে সামনের সারির গুরুত্বপূর্ণ চরিত্রে অলোক মাহমুদ নিয়ে এলেন। একে একে ট্রাংক রহস্য, তিন হুজুরের গল্প, অনশন, হযবরল, এরি নাম কি স্বাধীনতা’র মতো অনেক মঞ্চ ও পথ নাটকে তিনি তার প্রতিভার সাক্ষর রেখে চললেন।

ইউটিউব ও অনলাইন সোস্যাল মিডিয়ার যুগে আজকাল সাধারন মঞ্চ কর্মী পাওয়াই দুষ্কর, সেখানে নোবেল এর মতো প্রতিভাবান পরিশ্রমী এমন নিয়মিত একজন নার্ট্যকর্মী পাওয়া যেকোন মঞ্চ নাটকের দলের জন্য আর্শিবাদ। জীবনের শেষ সময়টা পর্যন্ত তিনি সমীকরন থিয়েটারের জন্য যে অবদান রেখেছেন তার জন্য আমরা সবাই কৃতজ্ঞ হয়ে রইলাম।

তার ভেতরে শিল্পচর্চার এক অন্যরকম ক্ষুদা ছিল। তাই তিনি তার শিল্পচর্চার জন্য কোন নিদির্ষ্ট সীমা নির্ধারন করেন নি। শুধু মঞ্চ নাটকেই তিনি তার প্রতিভাবে সংকুচিত করে রাখেন নি। এর পাশাপাশি তিনি নিয়মিত সংগীত চর্চা ও করে গেছেন। বাংলাদেশ পুলিশে প্রশাসনের মতো ব্যস্ততম ও সম্মানীত স্থানে চাকুরী করার পরও তিনি নিজেকে শিল্পী হিসেবেই গন্য করতেন।

যতটা মনে পড়ে খুব সম্ভবত ২০১৩ সালে রিয়েলিটি শো এটিএন নার্ট্যযুদ্ধে তিনি তখন অভিনেতা ক্যাটাগরি’তে প্রতিযোগী হিসেবে রেজিষ্ট্রেশন করেন। কিন্ত আমি চাপাচাপি করে তাকে পরিচালক ক্যাটাগরিতেও রেজিষ্ট্রেশন করতে বলাতে তিনি তা করেন। আমি তার মাঝে সবসময় একটা সৃর্ষ্টিশীল মনকে অনুভব করতে পারতাম এবং ঠিক তাই হল- তিনি প্রতিযোগীতায় চট্টগ্রামের নাট্যযোদ্ধা পরিচালক হিসেবে উত্র্তীন্ন হয়ে চট্টগ্রাম কে প্রতিনিধিত্ব করেন সমগ্র দেশবাসীর সামনে। এরপর বাকীটাতো সবই ইতিহাস। এরপরটা শুধূই তার সামনে এগিয়ে চলার গল্প।

টিভি, মঞ্চ , অনলাইন সোস্যাল প্লাটফর্মে একাধারে রচনা, নির্দেশনা, অভিনয় করে গেছেন। কখনো বা ম্যাগাজিনের মডেলিং এ আবার কখনো বা পত্রিকার পাতার লিখনীতে তিনি রেখেছেন তার শিল্পকর্মের অন্যন্য কিছু ছাপ।

আমার সাথে কথা হলে তিনি প্রায়শই একটা কথা বলতেন- “বুঝলি টাকা জমাচ্ছি একটা ক্যামেরা কিনব। নিজের মতো করে কিছু কাজ বানাব।” আর সেই ক্যামেরা কেনা হল না। নিজের ক্যামেরার ভিউফাইন্ডারে নিজের চোখটা তার আর রাখা হল না।

সমীকরন থিয়েটার ছাড়াও বিভিন্ন সাংস্কৃতিক প্রতিষ্ঠানের সাথে তিনি নিজেকে সংযুক্ত রেখেছেন চট্টগ্রাম জেলা শিল্পকলা একাডেমীর সদস্য, বিন্দুবিকাশ থিয়েটারে সাবেক সভাপতি, ফেডারেল এসোসিয়েশন অব আর্ট এন্ড আর্টিষ্ট (ফাআআআ) এর সদস্য, চট্টগ্রাম মিডিয়া ঐক্যজোটের সাংগঠনিক সম্পাদক, চ্যানেল আরএ প্রযোজনা অর্ধিকর্তা, রাইডিং মিডিয়া, বাংলাধারা সহ আরো নানান সামাজিক সাংস্কৃতিক সংগঠনের সাথে তিনি ওতপ্রোতভাবে জড়িত ছিলেন।

শিল্পী চলে যায় কিন্তু তার শিল্প রয়ে যায়। তার নির্মিত গোল্ডেন, অদৃষ্য দেয়াল, একটি স্বপ্নের ইতি, সাক্ষী, চলমান, উচুঁনিচু’র কাজ গুলো এখনো তার ইউটিউব চ্যানেল নোবা ক্রিয়েশন এর গ্যালারীতে শোভা পাচ্ছে। তার ইচ্ছে ছিল তার কাজগুলো নিয়ে একটা একক প্রদর্শনী হবে। আর হলনা।

তার সবচাইতে বড় যে বৈশিষ্ট্য আমার কাছে খুব ভালো লাগত তা হল তা সদা হাস্যজ্জ্বল মুখ মন্ডল। শত কাজের চাপ, শত সমস্যার মাঝে এতটা প্রানউৎফুল্ল, হাস্যজ্বল, বিনয়ী এমন একজন মানুষ এর সচরাচর সহচার্য খুবই দুষ্কর।

এমন একজন ক্ষনজন্মা ব্যাক্তিত্বের প্রয়ান সত্যিই চরম বেদনাদায়ক। যারা তার খুব সান্নিধ্য লাভ করেছিলেন শুধু মাত্র তারাই বুঝবেন এর বেদনা। আপনার বাড়ীর বাগানের সবচাইতে বেশী ফলদায়ক বৃক্ষ আকর্ষিক বজ্রাঘাতে পতিত হলে আপনি যেমন ক্ষতিগ্রস্থ হবেন, চট্টগ্রামের শিল্পাঙ্গন আজ সেরুপ ক্ষতিগ্রস্থ হল আর আকাশের একটি উজ্জ্বল নক্ষত্র কৃষ্ণ গহব্বরে হারিয়ে গেল।

দীর্ঘদিন দূরারোগ্য ব্যাধি ক্যান্সারে ভোগার পর তিনি দেশ বিদেশের বিভিন্ন হাসপাতালে চিকিৎসা গ্রহন করেছেন। চিকিৎসাকালীন সময়ে গত ফেব্রুয়ারী ০১ তারিখে শয্যাসায়ী নোবেল এর একটি ফেইসবুক স্টাটাস- “সুস্থ থাকা যে আল্লাহ তায়ালা প্রদত্ত কতবড় নেয়ামত, তা কেবল হাসপাতালে থাকলে বোঝা যায়।” দীর্ঘ দিন রোগের সাথে যুদ্ধ করে, তিনি বিগত ১৯ এপ্রিল রাতে পরলোকগমন করেন।

লেখকঃ- সদস্য- জেলা শিল্পকলা একাডেমী, চট্টগ্রাম।

ট্যাগ :

এবি বাকী