বাংলাদেশ, বৃহস্পতিবার, ২২ আগস্ট ২০১৯

পটিয়ায় সিএনজি অটোরিকশা থেকে মাসে দশ লাখ টাকা টোকেন বাণিজ্য!

প্রকাশ: ২০১৯-০৬-১৬ ১৪:১৬:৪৪ || আপডেট: ২০১৯-০৬-১৬ ১৪:১৬:৫০

কাউছার আলম, পটিয়া »

দক্ষিণ চট্টগ্রামের পটিয়া উপজেলায় আরাকান সড়কের বিভিন্ন স্থানে টোকেন দিয়ে মাসে ১০ লাখ টাকার চাঁদা আদায়ের অভিযোগ পাওয়া গেছে।

উপজেলার থানার মোড়, মনসা বাদাম তল, শান্তির হাট,নিমতল দরগাহ, আমজুর হাট,বাস ষ্টেশন, মুজাফরাবাদ সহ আরো বেশ কয়েকটি স্থানে প্রায়শই মোটর সাইকেল ও সিএনজির ডকুমেন্ট চেক করে ট্রাফিক পুলিশ। এটি এখন নিত্যনৈমিত্তিক ঘটনা হয়ে দাঁড়িয়েছে। কিন্তুু একটু খেয়াল করলেই দেখা যায়, কিছু সিএনজি পুলিশের সিগনাল অমান্য করে চলে যায়। আর কিছু সিএনজি চেকপোস্টে দাঁড়িয়ে যায়।

এব্যাপারে কয়েকজন সিএনজি চালক জানান, যাদের টোকেন আছে তাদের গাড়ী ধরে না। টোকেন না থাকলে ধরে, ধরলে পুলিশকে টাকা দিতে হয়।

সিএনজি চালকদের এই অভিযোগের বিষয়ে গত কয়েকদিন ধরে যাত্রী বেশে সরেজমিনে গেলে দেখা যায়, থানার মোড় থেকে শান্তির হাট পর্যন্ত ট্রাফিক পুলিশ, কালার পুল পুলিশ ফাড়ির সদস্যরা স্থান বদল করে প্রায়শই চেকপোস্ট বাসায়। সিএনজি চালিত ট্যাক্সি, মোটর সাইকেল ও মিনি ট্রাকের লাইসেন্স ও অন্যান্য ডকুমেন্ট পরীক্ষা-নিরীক্ষা করে। অনেক সময় দেখা যায়, পুলিশ সিগনাল দিলেও কিছু ট্যাক্সি তা অমান্য করে চলে যায়। আর কিছু ট্যাক্সি আটকে রাখে পুলিশ।

এক্ষেত্রে দেখা যায়, টোকেনধারী ট্যাক্সিগুলো সিগনাল অমান্য করে চলে যায়। এই ব্যাপারে একাধিক সিএনজি চালকের সঙ্গে কথা বললে তারা জানালেন, পটিয়া, চন্দনাইশ, দোহাজারি, সাতকানিয়া, লোহাগড়া, লামা, বান্দরবান, চকরিয়া,পেকুয়া, আনোয়ারা, বাশখালি রোডের বিভিন্ন এলাকা থেকে সাধারণ যাত্রী নিয়ে ট্যাক্সি গুলো ক্রসিং ও মইজ্জ্যারটেক পর্যন্ত আসার টোকেন রয়েছে। টোকেন থাকলে পুলিশ ধরবে না। টোকেন না থাকলে ধরবে। তো টোকেন আছে কিভাবে জানবে পুলিশ এমন প্রশ্নের জবাবে চালকেরা জানান, ট্যাক্সির সামনে গ্লাসে টোকেন লাগানো আছে। টোকেন না থাকলে পুলিশের সিগনাল অমান্য করার সাহস কি কারো আছে? মোটর সাইকেল দিয়ে দৌঁড়ে আটকে রাখবে। মারধর ছাড়াও অতিরিক্ত টাকা গুণতে হবে।

খোঁজ নিয়ে ও চালকের সাথে কথা বলে জানা যায়, চট্টগ্রাম নম্বরধারী বা নম্বরবিহীন টোকেন নিয়ে এসব সিএনজি চলাচল করে। এভাবে দক্ষিনের প্রত্যন্ত অন্ঞল হতে আসা সিএনজি গুলো মাসিক টোকেন নিয়ে প্রবেশ করতে হয়। এসব এলাকা থেকে প্রতিদিন প্রায় দুই হাজার সিএনজি যাতায়ত করে।

চালকেরা আরো জানান, গত ২-৩ বছর টোকেনের দাম ছিল ৩০০ টাকা। তা বাড়তে বাড়তে এখন ৪৫০টাকায় দাঁড়িয়েছে। প্রতি মাসে ৪৫০ টাকা হারে দুই হাজারের ও বেশি সিএনজি হতে মাসে ১০লাখ টাকার ও বেশি টোকেন বাণিজ্য করা হয়।

এছাড়াও লাইনম্যান খরচের প্রতি সিএনজি হতে দিনে ২০ টাকা করে চাঁদা তোলা হয়। দিনে অন্তত দুই হাজারের ও বেশি সিএনজি এ সড়ক দিয়ে বিভিন্ন উপজেলায় চলাচল করে। সেই হিসাবে দিনে ২০ হাজার টাকার চাঁদা উত্তোলন করা হয়। মাসে দাঁড়ায় ছয় লাখ টাকা। টোকেন আর চাঁদা মিলিয়ে মাসে ১৬ লাখ টাকার বেশি চাঁদাবাজি হয় সড়কে।

চট্টগ্রাম অটোরিকশা অটোটেম্পো শ্রমিক ইউনিয়নের নামে দক্ষিণ চট্টগ্রামে প্রায় দশ হাজার সিএনজি অটোরিকশা থেকে মাসিক কর্ণফুলি উপজেলার জন্য টোকেন মুল্য ১২০ টাকা, আনোয়ারা উপজেলার জন্য ২৫০ টাকা, বাঁশখালী উপজেলার জন্য ৩৫০ টাকা, পটিয়ার জন্য ২০০ টাকা এবং অন্যান্য উপজেলার জন্য ৫০০-১০০০ টাকা আদায় করা হয় হলুদ একটা কাগজের উপর সীল মেরে।

সীল সম্বলিত হলুদ এ কাগজে ইউচুফ নামের এক ব্যাক্তির নাম ও মোবাইল নাম্বার দেয়া আছে। উক্ত নাম্বারে যোগাযোগ করা হলে তিনি জানান, আমি সমিতির লাইনম্যান। আমার দায়িত্ব গাড়ি গুলো সু-শৃঙ্খল ভাবে পরিচালনা করা।

টোকেনের বিনিময়ে চাঁদা আদায় করার বিষয়টি অস্বীকার করে তিনি বলেন,আমি এত টাকা আদায় করিনা। সামান্য চা নাস্তা খাওয়ার জন্য নিই। তবে চাঁদাবাজি সম্পর্কে একাধিক সিএনজি চালক জানান, মাদের হতে টোকেনের মাধ্যমে প্রতি মাসে টাকা নেন। না দিলে পুলিশ ও পার্টির লোকজন দিয়ে নানা ভাবে ভয়ভীতি প্রদর্শন ও হয়রানি করা হয়।

টোকেন বাণিজ্যের সঙ্গে জড়িত একাধিক শ্রমিক নেতা বলেন, নেতাকে বড় অঙ্কের চাঁদা দিতে হয়। স্থানীয় কিছু নেতাকে মাসোহারা দিতে হয়। এছাড়াও পুলিশের বিভিন্ন স্তরের কর্মকর্তাদের মোটা অঙ্কের মাসোহারা দিতে হয়। টোকেন আর চাঁদাবাজির কারণে বেড়েছে ট্যাক্সি ভাড়াও। এর প্রভাব গুণতে হচ্ছে যাত্রীদের।

এই চাঁদাবাজির ভাগবাটোয়ারা ও দখল-বেদখল নিয়ে প্রায়ই সংঘাত সংঘর্ষের ঘটনা ঘটে। শ্রমিক ইউনিয়নের বিবাদমান দুই পক্ষ ছাড়া ও স্থানীয় নেতাদের একাধিক গ্রুপ এই চাঁদাবাজির ঘটনায় জড়িত। পুলিশের প্রত্যক্ষ ইন্ধন থাকায় প্রকাশ্যে চাঁদাবাজি চলে আসছে বলে অভিযোগ রয়েছে।

এবিষয়ে জানতে চাইলে পটিয়া -বোয়ালখালী জোনের ট্রাফিক ইন্সপেক্টর বশিরুল ইসলাম জানান, মহা সড়কের পাশে যে সকল সিএনজি স্টেশন রয়েছে, আর যারা নিয়ন্ত্রণ করে তাদের নিজস্ব লোকবলের মাধ্যমে টোকেনের বিনিময়ে তাদের দৈনিক খরচ মেটানোর জন্য টাকা আদায় করে। তবে আমাদের কাছে কেউ অভিযোগ নিয়ে আসলে তা আমরা তদন্ত সাপেক্ষে আইনানুগ ব্যাবস্থা নিয়ে থাকি।

বাংলাধারা/এফএস/এমআর

ট্যাগ :