বাংলাদেশ, শুক্রবার, ২৩ আগস্ট ২০১৯

কালুরঘাট সেতু নির্মাণের জন্য প্রয়োজনে আমি ‘আওয়ামী লীগ’ হয়ে যাব: বাদল

প্রকাশ: ২০১৯-০৮-০৯ ২২:১৬:৩২ || আপডেট: ২০১৯-০৮-০৯ ২২:২০:৫৫

বাংলাধারা প্রতিবেদন »

চট্টগ্রাম-৮ আসনের সংসদ সদস্য মঈন উদ্দীন খান বাদল বলেছেন, ‘আমার রাজনৈতিক পরিচয় যদি কালুরঘাট সেতু নির্মাণের অন্তরায় হয়ে থাকে প্রয়োজনে আমি আওয়ামী লীগ হয়ে যাব। তারপরও যেন কালুরঘাট রেল কাম সড়ক সেতু নির্মাণের কাজ শিঘ্রই শুরু হয়।’

তিনি বলেন, ‘আমার বয়স হয়েছে, আমি এখন জীবন সায়ান্যে। জীবনে আমার চাওয়া পাওয়ার কিছুই নেই। আমার জীবদ্দশায় আমি নতুন কালুরঘাট সেতু দেখে যেতে চাই। এর জন্য যদি আমার রাজনৈতিক পরিচয় বিসর্জন দিতে হয় তাতেও আমি রাজি।’

শুক্রবার (৯ আগস্ট) দুপুরে চট্টগ্রাম ক্লাবে অনুষ্ঠিত নগরীর জ্যেষ্ঠ সাংবাদিকদের সঙ্গে এক মতবিনিময় সভায় প্রবীণ এই রাজনীতিক এসব কথা বলেন। মতবিনিময় সভায় চট্টগ্রাম প্রেসক্লাবের সভাপতি আলী আব্বাস, সাধারণ সম্পাদক চৌধুরী ফরিদ এবং প্রবীণ সাংবাদিক এম নাসিরুল হকও বক্তব্য রাখেন।

জাতীয় সংসদে এবং প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনাকে ব্যক্তিগতভাবে একাধিকবার বলার পরও চট্টগ্রামের কালুরঘাটে কর্ণফুলী নদীর ওপর সড়কসহ রেলসেতুর নির্মাণকাজ শুরু না হওয়ায় হতাশা প্রকাশ করে স্থানীয় সংসদ সদস্য মঈন উদ্দীন খান বাদল বলেন, গত দশ বছর ধরে সংসদে ও সরকারের বিভিন্ন স্তরে এই কালুরঘাট সেতুর কথা বার বার বলার পরও রহস্যজনক কারণে সেতুর প্রকল্পটি ঝুলে আছে।’

তিনি বলেন, ‘সেতুটি নির্মাণের জন্য চারবার সমীক্ষা হয়েছে। সর্বশেষ কোরিয়ান একটি সংস্থা সমীক্ষা করে ১১৭০ কোটি টাকায় রেল কাম সড়ক সেতু নির্মাণের একটি প্রকল্প প্রস্তাব দিয়েছে এবং ৮০০ কোটি টাকা অর্থায়নের প্রস্তাবও দিয়েছে। বাংলাদেশ সরকারকে দিতে হবে মাত্র ৩৭০ কোটি টাকা।’

হতাশ কন্ঠে বাদল বলেন, ‘গত ১০ বছরে বাংলাদেশে হাজার হাজার ব্রিজ হয়েছে। বড় বড় ব্রিজ হয়েছে। সারাদিনে তিনটা গাড়িও চলে না, এমন ব্রিজও হয়েছে। অথচ কালুরঘাট সেতুর ওপর দিয়ে দিনে ৫০ হাজার মানুষ শহরে আসে আর ৫০ হাজার মানুষ যায়, গাড়ির কথা বাদ দিলাম। মাত্র ৩৭০ কোটি টাকার জন্য জনগুরুত্বপূর্ন এই সেতুটি কেন হচ্ছে না তা আমার বোধগম্য নয়।’

তিনি বলেন, ‘এখন কালুরঘাট সেতু (রেলসেতু) যে অবস্থায় আছে, সেটার ওপর দিয়ে মাত্র দুই কি তিনটি ট্রেন চলে। দোহাজারী বিদ্যুৎকেন্দ্রের জন্য ফার্নেস অয়েল যায় আর একটা প্যাসেঞ্জার ট্রেন যায়, আরেকটা আসে। সেই ট্রেনগুলো মাত্রা আড়াই মাইল বেগে চলে, কখন ব্রিজ ভেঙ্গে পড়বে এই ভয়ে। আমি বলতে চাই, ব্রিজ আর কতটা ভাঙলে নতুন করে বানানো হবে?’

প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার সঙ্গেও এ বিষয়ে কথা হয়েছে জানিয়ে বাদল বলেন, ‘গত রমজানে, ২৬ রোজার দিন আমি গণভবনে প্রধানমন্ত্রীর সঙ্গে দেখা করতে গিয়েছিলাম। তিনি বললেন, অসুস্থ শরীর নিয়ে আপনি কেন এসেছেন, আপনি কী চান? আমি বলললাম, আপনার কাছে আমার চাওয়ার কিছু নেই, শুধু ব্রিজটা করে দিলে হবে। প্রধানমন্ত্রী বললেন, আপনার ব্রিজ আমি করে দেব। কিন্তু এরপরও হচ্ছে না।’

চট্টগ্রামের দোহাজারী থেকে কক্সবাজারের ঘুমধুম পর্যন্ত নির্মাণাধীন রেললাইনের প্রসঙ্গ টেনে তিনি বলেন, ‘বারবার বলছি, কালুরঘাটে সড়কসহ রেলসেতু না করলে কক্সবাজার পর্যন্ত রেললাইন বানিয়ে কোনো লাভ হবে না। ট্রেন কি বোয়ালখালীর গোমদণ্ডী পর্যন্ত আসার পর লাফ দিয়ে শহরে যাবে? ট্রেন যেতে না পারলে সেই রেললাইন বানিয়ে লাভ কী? সবার আগে দরকার ছিল কালুরঘাট সেতু। সেটি বানানোর পর তারপর আস্তে আস্তে রেললাইন এগিয়ে নেওয়া দরকার ছিল। অথচ এখন প্রথমে বানাচ্ছে রেলস্টেশন, তারপর রেললাইন। আর কালুরঘাট সেতুর কোনো খবর নেই।’

কর্ণফুলী টানেলের প্রসঙ্গ টেনে তিনি বলেন, ‘কালুরঘাট সেতু থেকে কর্ণফুলী টানেলের দূরত্ব ৩৯ কিলোমিটার। চান্দগাঁও-মোহরার মানুষ কি ৩৯ কিলোমিটার ঘুরে বোয়ালখালী-পটিয়ায় যাবে? টেমস নদীতে যদি ৩০-৪০টা ব্রিজ থাকতে পারে, কর্ণফুলী নদীর ওপর আরেকটা ব্রিজ বানালে ক্ষতি কোথায়?’

পায়রা নদীতে বন্দর বানানোর প্রসঙ্গ তুলে ধরে তিনি বলেন, ‘পায়রায় বন্দর বানানো হলো। অথচ এই বন্দরে নাকি জাহাজ ঢুকতে পারে না। ক্রমাগত ড্রেজিং করতে হবে, তা-ও সাগরের ৩০ মাইল গভীরে। তাহলে এই বন্দর কেন বানানো হল ? চট্টগ্রাম বন্দর থেকে টাকা নেওয়া হয়েছে, আমরা চট্টগ্রামের মানুষ কি এটা নিয়ে কথা বলতে পারব না?’

মহেশখালীর মাতারবাড়িতে কয়লাভিত্তিক বিদ্যুৎকেন্দ্রের প্রসঙ্গে তিনি বলেন, ’৩৬ হাজার কোটি টাকায় দেড় হাজার মেগাওয়াট বিদ্যুৎকেন্দ্র বানানো হচ্ছে। আর পাবনায় সমান উৎপাদন ক্ষমতার বিদ্যুৎকেন্দ্র বানানো হচ্ছে এক লাখ কোটি টাকায়। আমি প্রধানমন্ত্রীকে বলেছি- মানুষ একদিন কিন্তু এসব প্রশ্ন তুলবে। মানুষের মুখ এক, দুই, তিনদিন বন্ধ থাকবে, চতুর্থদিন কিন্তু মুখ খুলবে।’

চট্টগ্রামের অপরিকল্পিত উন্নয়নের প্রসঙ্গ টেনে তিনি বলেন, ‘আমি একদিন স্পিকারকে বললাম, চট্টগ্রাম হচ্ছে অষ্টম আশ্চর্যের শহর। এই শহরে ফ্লাইওভার বানানো হয়েছে। এই ফ্লাইওভারের ওপরেও পানি ওঠে, নিচেও পানি ওঠে। নগর পরিকল্পনাবিদ, দলের মন্ত্রী-এমপিদের মতামতের তোয়াক্কা না করে এই ফ্লাইওভারগুলো বানানো হল কেন? প্রধানমন্ত্রীকে বলেছি- নির্বাচিত প্রতিনিধিকে বাদ দিয়ে সিডিএকে দিয়ে ৫ হাজার কোটি টাকার প্রকল্প বাস্তবায়ন করছেন, এ জন্য তো আপনাকে একদিন মামলা খেতে হবে।’

ব্রিটিশ আমলে ১৯৩০ সালে নির্মিত হয় ৭০০ গজ দীর্ঘ কালুরঘাট রেলসেতু। ১৯৫৮ সালে সেতুটি সব ধরনের যানবাহন চলাচলের জন্য উন্মুক্ত করে দেয় তৎকালীন পাকিস্তান সরকার। ৯০ বছর বয়সী সেতুটি এখন অনেকটাই ভাঙাচোরা আর জোড়াতালি দেওয়া। প্রতিদিন এই জীর্ণ সেতুর ওপর দিয়ে চলছে ট্রেন ও যানবাহন। চট্টগ্রাম নগরীর থেকে বোয়ালখালী উপজেলা এবং পটিয়া উপজেলার তিন ইউনিয়নের মানুষের চলাচলের জন্য এটিই একমাত্র সেতু। আর দক্ষিণ চট্টগ্রামমুখী ট্রেন চলাচলের জন্যও এটিই একমাত্র সেতু।

বোয়ালখালী-কালুরঘাট সেতু বাস্তবায়ন পরিষদসহ স্থানীয় জনসাধারণ সেতুর দাবিতে প্রায় দেড় দশক ধরে আন্দোলন করে আসছে। প্রথমে সড়কসহ রেলসেতু নির্মাণের জন্য সমীক্ষা হলেও সম্প্রতি দ্বিমুখী রেলসেতু করার উদ্যোগ নিয়ে এগুচ্ছে রেল মন্ত্রণালয়। বারবার আশ্বাসের পরও সেতু বাস্তবায়ন করাতে না পেরে সম্প্রতি চট্টগ্রাম-৮ (বোয়ালখালী, চান্দগাঁও-মোহরা) এলাকার সাংসদ মঈন উদ্দীন খান বাদল ডিসেম্বর পর্যন্ত সময় বেঁধে দিয়ে অন্যথায় সংসদ থেকে পদত্যাগের ঘোষণা দেন।

বাংলাধারা/এফএস/এমআর

ট্যাগ :