বাংলাদেশ, রোববার, ১৫ সেপ্টেম্বর ২০১৯

চামড়ার শিল্পে অস্থিরতা, দায় কার?

প্রকাশ: ২০১৯-০৮-১৯ ১৬:৩৩:৫২ || আপডেট: ২০১৯-০৮-১৯ ১৬:৩৭:৫৬

আড়তদাররা চামড়া না কেনায় মৌসুমী ব্যবসায়ীরা তা নগরীর রাস্তায় ফেলে চলে যায়। পরে সিটি কর্পোরেশন তা তুলে নিয়ে ময়লার ভাগাড়ে ফেলে দেয়। ছবি- সংগৃহীত

তারেক মাহমুদ »

চামড়ার শিল্পে অস্থিরতার দায় আসলে কার? সরকারের মন্ত্রী বলছেন বিএনপি চামড়া কিনে ফেলে দিয়েছে সরকারকে বেকায়দায় ফেলতে। আবার বিএনপি বলছে সরকার চামড়া শিল্প ধ্বংস করেছে লুটপাটের মাধ্যমে। আর মাঠ পর্যায়ে ট্যানারি মালিকরা দোষ দিচ্ছেন আড়তদারদের। আড়তদারদাররা দোষ দিচ্ছেন ট্যানারি মালিকদের। আসলে দোষ কাদের?

সূত্র জানায়, সরকারের পক্ষ থেকে ট্যানারি মালিক, আড়তদারসহ ব্যবসায়ীদের সঙ্গে এর মধ্যে সরকারের বৈঠক হয়েছে। শিল্প মন্ত্রণালয়ও ব্যস্ত সময় পার করছে চামড়া বাজারের স্থিতিশীলতায়।

তাৎক্ষণিকভাবে উঠিয়ে নেওয়া হয়েছে কাঁচা চামড়া রপ্তানির নিষেধাজ্ঞা। কিন্তু বকেয়া পরিশোধ না হলে ট্যানারিতে চামড়া বিক্রি করা হবে না এমন হুঁশিয়ারি দিলেও তা থেকে সরে এসেছে আড়তদাররা। আর ট্যানারি মালিকরা বলছেন, গত শনিবার থেকেই আমাদের আড়তদারদের কাছ থেকে চামড়া কেনার কথা ছিল; কিন্তু তাদের সিদ্ধান্তের কারণে তা বাস্তবায়ন হয়নি। আর আর্থিক সংকটের কারণে ট্যানারিগুলো প্রথম থেকে কাঁচা চামড়া কিনতে পারেনি। তবে আজ থেকে সরকার নির্ধারিত দামেই চামড়া কিনছে ট্যানারিগুলো। কিন্তু মাঝখান থেকে সাধারণ মানুষ দাম পেল না চামড়ার। ট্যানারি মালিক ও আড়তদাররা ঠিকই লাভ করছে।

এদিকে, চট্টগ্রামে বর্তমানে  কোনো ট্যানারি নেই। গত এক দশকে বন্ধ হয়ে গেছে সবকটি ট্যানারি। এই সুযোগে চট্টগ্রামের চামড়া ব্যবসায়ীদের জিম্মি করে ফেলেছেন ঢাকার ট্যানারি মালিকরা। যারা গত বছর চামড়া বিক্রির টাকা পর্যন্ত এখনো পরিশোধ করেনি। ফলে চামড়া বিক্রিতেও ভয় পাচ্ছেন চট্টগ্রামের আড়তদাররা। তাদের আশঙ্কা ট্যানারি মালিকদের কৌশলের কারণে এবারও বকেয়ায় চামড়া বিক্রি করতে হবে তাদের। তা যদি হয় তাহলে চট্টগ্রামের চামড়ার আড়তদাররা পুঁজি হারিয়ে ফতুর হয়ে যাবে।

এরই ফলশ্রুতিতে চট্টগ্রামের আড়তদাররা মৌসুমী ব্যবসায়ীদের কাছ থেকে চামড়া না কেনায় তারা কোটি কোটি টাকা মূল্যের চামড়া শহরের রাস্তায় ফেলে যায়। চামড়ার পচনে দূর্গন্ধ ছড়ালে সিটি কর্পোরেশন চামড়াগুলো রাস্তা থেকে তুলে নিয়ে ময়লার ভাগাড়ে ফেলে দেয়।  

শাহ আলম নামে এক আড়তদার জানান, গত বছরের চামড়া বিক্রির টাকা বকেয়া থাকায় পুঁজির অভাবে এবার চট্টগ্রামের অর্ধশতাধিক আড়তদার চামড়া সংগ্রহ করতে পারেনি। অর্ধশত আড়তদার চামড়া সংগ্রহ করলেও তা নিয়ে বিপাকে পড়েছেন। কারণ ঢাকার ট্যানারির মালিকরা চামড়া কেনার জন্য এখনো পর্যন্ত চট্টগ্রামের কোনো আড়তদারের সঙ্গে যোগাযোগ করেননি। 

চট্টগ্রাম কাঁচা চামড়া আড়তদার ব্যবসায়ী সমবায় সমিতির সাবেক সভাপতি মোসলেম উদ্দিন বলেন, রিফ লেদার ও মদিনা ট্যানারির কাছে চামড়া বিক্রি করলে নগদ টাকা পাওয়া যায়। কিন্তু ঢাকার ট্যানারি মালিকদের কাছে বিক্রি করলে টাকা বাকি থেকে যায়। টাকা পেতে পেতে আরেক কোরবানি এসে যায়। কয়েক বছর ধরে কোরবানি ঈদে লোকসান দিতে দিতে পুঁজি হারিয়েছি আমরা। কোরবানি ঈদে আমরা ধার করে টাকা নিয়ে ও বাকিতে চামড়া ক্রয় করে থাকি। ঢাকার ট্যানারি মালিকেরা নগদ টাকা দিয়ে দিলে আমরা উপকৃত হতে পারতাম। ধার করা টাকা শোধ করতে পারতাম।

তিনি বলেন, অনভিজ্ঞতা ও লোকসান দিতে দিতে ২০টি ট্যানারি বন্ধ হয়ে গেছে। চট্টগ্রামের ট্যানারিগুলো থাকলে চট্টগ্রামের চামড়া ব্যবসায়ীরা ঢাকামুখী হতো না। চামড়া শিল্পকে রক্ষা করতে হলে ট্যানারি মালিকদের মতো চামড়ার আতড়দারদেরকেও স্বল্প সুদে ব্যাংক ঋণ দিতে হবে।

চামড়ার এ অবস্থার পরিপ্রেক্ষিতে বাংলাদেশ চামড়া, চামড়াজাত পণ্য ও পাদুকা রপ্তানি অ্যাসোসিয়েশনের মহাসচিব জয়নাল আবেদিন বলেন, ট্যানারিগুলোর আগে থেকেই অর্থ সংকট ছিল। তারপরও এবার চামড়া নিয়ে যে অচলাবস্থার সৃষ্টি হয়েছে তা প্রত্যাশিত নয়। বিশেষ করে চামড়া ফেলে দেওয়ার বিষয়টি ভালো সিদ্ধান্ত ছিল না। এবার আবহাওয়াগত কারণে চামড়ায় অন্য সময়ের তুলনায় দুই থেকে তিন ঘণ্টা আগে লবণজাত করা উচিত ছিল; কিন্তু মৌসুমী ব্যবসায়ী যারা মাঠপর্যায়ে চামড়া সংগ্রহ করেছে তারা একদিকে লবণজাতে বিলম্ব করেছে, অন্যদিকে সঠিক দাম না পাওয়ায় হতাশায় এ কাজটি করেছে।

বাংলাদেশ হাইড অ্যান্ড স্কিন মার্চেন্ট অ্যাসোসিয়েশনের (বিএইচএসএমএ) সভাপতি দেলোয়ার হোসেন জানান, আমরা প্রথম দিকে ট্যানারিগুলোর বকেয়া পরিশোধ না করা পর্যন্ত চামড়া বিক্রি করব না বলে সিদ্ধান্ত নিলেও এখন সেখান থেকে সরে এসেছি। আজ থেকে ট্যানারিগুলোয় চামড়া বিক্রি করা হচ্ছে।

এমন পরিস্থিতির কারণ কী জানতে চাইলে তিনি বলেন, ট্যানারি মালিকরা প্রতি বছরই কোরবানির আগে আড়তদারদের সঙ্গে মিটিং করে। কীভাবে চামড়া সংগ্রহ ও কেনা হবে। এবার এ ক্ষেত্রে কিছুটা ব্যত্যয় হয়েছিল। আলোচনা করা হলে এ বছর চামড়ার এমন পরিস্থিতি হতো না। আগের যে বকেয়া টাকা রয়েছে, তা ২২ আগস্ট এফবিসিসিআই’র মাধ্যমে আদায়ের কথা রয়েছে। তারা দু’পক্ষের সঙ্গে বসে সমাধান করে দেবে। যে সমস্যা ট্যানারির মধ্যে রয়ে গেছে, তা সমাধানে মন্ত্রী ও উপদেষ্টা কাজ করবেন বলে জানিয়েছেন।

সংশ্লিষ্ট ব্যবসায়ীরা বলছেন, হেমায়েতপুরে চামড়া শিল্পনগরী শতভাগ চালু না হওয়ার আগে হাজারীবাগে সবকিছু আইনের মাধ্যমে বন্ধ করে দেওয়া উচিত হয়নি। এখনও সেখানে অনেক কারখানার চামড়ায় লবণজাত করা হয়। একইসঙ্গে কোরবানির সময়ের চামড়া সংগ্রহের জন্য চামড়া ব্যবাসয়ীরা বেড়িবাঁধসহ শহরের বিভিন্ন স্থানে চামড়ায় লবণীকরণ করে থাকে। কিন্তু এ কাজটি হাজারীবাগে করলেই অপরাধ। যেহেতু পোস্তার কাছাকাছি হাজারীবাগ, সেহেতু সরকারের উচিত হবে পুরো বিষয়টি আবারও বিবেচনা করার।

সার্বিক অবস্থা সম্পর্কে বাংলাদেশ ট্যানার্স অ্যাসোসিয়েশনের সাধারণ সম্পাদক সাখাওয়াত উল্লাহ বলেন, ট্যানারির কাছে আড়তদারদের চামড়া বিক্রি করা বা না করা এখন সেটি তাদের বিষয়। তাদের বক্তব্য অনুযায়ী সেগুলো রপ্তানির জন্যও রেখে দিতে পারেন। আবার বিক্রিও করতে পারেন। কিন্তু কেন এ অবস্থার সৃষ্টি হলো সে প্রসঙ্গে তিনি বলেন, গেল দুই তিন বছর ধরে আড়তদারদের সঙ্গে আমাদের আর্থিক লেনদেনে সমস্যা সৃষ্টি হয়েছে। তার আগে আড়তদারদের সব টাকাই আমরা পরিশোধ করেছি। হাজারীবাগ থেকে ট্যানারি স্থানান্তর, হেমায়েতপুরে নতুন অবকাঠামো নির্মাণ, আগের সংগৃহীত চামড়া বিক্রি না হওয়ায় মূলত আর্থিক সংকটের কারণেই এবার চামড়া কেনায় জটিলতা তৈরি হয়েছে।

বাংলাধারা/এফএস/এমআর/টিএম

ট্যাগ :