বাংলাদেশ, শুক্রবার, ৩ এপ্রিল ২০২০

চ্যাম্পিয়নদের হারাতে দেওয়া যাবেনা;পরিচর্যাই দিতে পারে উজ্জ্বল ভবিষ্যত

প্রকাশ: ২০২০-০২-১১ ১৯:১৭:৩৯ || আপডেট: ২০২০-০২-১১ ১৯:১৭:৪৬

ইফতেখার নিলয় »

ফাইনাল ম্যাচে প্রতিপক্ষ হিসেবে ভারত কে পাওয়া নিত্যনৈমিত্তিক ঘটনা বাংলাদেশ ক্রিকেটের। বড় ভাইয়েরা যেই হারের বৃত্ত থেকে বেরোতে পারছেনা, তা এবার উৎরে গেছে ছোটোরা। যদিও পূর্বে দুবার ভারতের কাছে ফাইনাল হারবার বেদনা সহ্য করেছে যুবারাও। শুধুমাত্র প্রমিলারাই এশিয়া কাপের ফাইনালে প্রথম দেখাতেই হারিয়ে দিয়েছিলো ভারত কে। সেটাই সম্ভবত বাংলাদেশ ক্রিকেটের প্রথম আন্তর্জাতিক ট্রফি।

আইসিসি ইভেন্টে এলো এবার প্রথম ট্রফি। অধরা স্বপ্নগুলো ধীরেধীরে পূরণ হতে শুরু করেছে। যে কাজটা আরো বছর পনেরো আগে মুশফিকরা করে ফেলার কথা ছিলো তা এবার করে দেখিয়েছে আকবর আলীরা।

২০১৬ তে ঘরের মাঠে আরেকবার সুবর্ণ সুযোগ হাতছাড়া করেছিলো মেহেদী মিরাজরা। বরাবরের মতোই অনূর্ধ্ব-১৯ দল বিশ্বকাপে ছাড়াও ঘরে-বাইরে বিভিন্ন সিরিজে দারুণ খেলে বেড়াচ্ছিলো। কিছুদিন আগেও নিউজিল্যান্ডের বিপক্ষে সিরিজ জিতে ঘরে ফিরেছিলো। এবার তো ঘরে ফিরছে একেবারে বিশ্বজয়ের তকমা গায়ে জড়িয়ে। দলের প্রতিটা ছেলে একেবারে সামর্থ্যের সর্বোচ্চটা দিয়ে খেলেছে বোলিং আর ফিল্ডিংয়ের ক্ষেত্রে।

ঝামেলা পাকিয়ে ফেলেছিলো ব্যাটিংয়ের বেলায়৷ ভারতের বিপক্ষে জাতীয় দলও বেশীরভাগ ম্যাচ হেরেছিলো ব্যাটিং ব্যর্থতায়। ভারত জন্মগত রান তাড়ায় পরিপক্ব, তাই ওদের যেকোনো দলের বিপক্ষেই আগে বোলিং করা সুবিধাজনক বলে বিবেচনা করা হয়। শুরু থেকেই বেশ দারুণ বোলিং করে গিয়েছে সাকিব, অভিষেক ও শরিফুল। মাঝে তৌহিদ হৃদয়ের খন্ডকালীন স্পিন বোলিংও কাজে দিয়েছে। ফিল্ডিং কে নম্বর দিতে গেলে একেবারে সর্বোচ্চ একশোই দিতে হবে।

ভারতের লেগ স্পিনার বিশ্নয় একাই দুমড়ে মুচড়ে দিয়েছিলো বাংলাদেশের ব্যাটিং অর্ডার। দারুণ খেলতে থাকা বাংলাদেশ হুট করেই ম্যাচ থেকে ছিটকে পড়ে যাচ্ছিলো। ঠিক সেখানেই ক্যাপ্টেন’স নক খেলে দলকে বিশ্বচ্যাম্পিয়নের তকমা লাগিয়ে দিলেন আকবর আলী। কোনোভাবেই ইমনের অবদান ভুলে যাওয়া যাবেনা। পায়ে তীব্র যন্ত্রণা নিয়েও ছেলেটা শেষ পর্যন্ত ব্যাটিং করে গিয়েছে। আকবর আর ইমনের জুটিই আবার ম্যাচে ফিরিয়েছিলো বাংলাদেশ কে।

বাংলাদেশের জয়ের পথে ভোগান্তির কারণ যেমন ভারতীয় বোলাররা, ঠিক তেমনি জয়ের পেছনে তাদের দেওয়া ত্রিশোর্ধ্ব অতিরিক্ত রানও বেশ সাহায্য করেছে। লাল-সবুজের প্রতিনিধিত্বকারী এই তরুণেরা যে কতোটা যোগ্যতাসম্পন্ন তা গত দুবছর ধরেই দেখা যাচ্ছিলো। একের পর সাফল্য ধরা দিচ্ছিলো এদের মাধ্যমেই।

দেশ ছাড়ার আগে আকবর আলী বলেছিলেন, ” আমরা যা খেলছি, তাতে ফাইনাল খেলা অসম্ভব কিছুই না।” আত্মবিশ্বাসী অধিনায়ক তাই বোনের মৃত্যুর শোক নিয়েও লড়ে গেছেন শেষ পর্যন্ত। দল যখন উইকেট হারিয়ে বিপর্যস্ত তখন অযথা অফ ষ্ট্যাম্পের বাইরের বলে ব্যাট না এগিয়ে দিয়েছিলেন বিচক্ষণতার পরিচয়। যেখানে তাদের বড় ভাইয়েরা একটানা ৪-৫ টি বল ডট হলেই ডাউন দ্যা উইকেট খেলতে গিয়ে উইকেট বিলিয়ে দেন, সে জায়গায় আকবর আলী নিজেকে তারচেয়েও বেশী পরিপক্ব প্রমাণ করেছে ফাইনালে। অযথা ঝুঁকি নিয়ে খেলার প্রয়োজন নেই, একটানা ছয় ওভার তার ব্যাট থেকে কোনো রান না আসলেও, তিনি ধৈর্য হারা হয়ে যাননি।

দলকে জেতানোর প্রচেষ্টা তার কমেনি আবেগ জাগ্রত হয়ে। এরচে বড় সাইন আর কি হতে পারে ? যা দিয়ে প্রমাণ হয় আকবর আলী একজন বড় মাপের ক্রিকেটার হতে যাচ্ছেন। শুধুমাত্র আকবর আলী নন- সাকিব, তামিম, ইমন, জয়, হৃদয়, রকিবুল, শামীম, শরিফুল, অভিষেক প্রতিটা ছেলেই দারুণ প্রতিভাবান। এরাই একদিন একসাথে এগিয়ে নিয়ে যাবে দেশের ক্রিকেটকে। ওদের পরিপক্বতায় একদিন আবার উল্লাসে মেতে উঠবো আমরা।

আক্ষেপের ব্যাপার হলো ভারত, পাকিস্তান, নিউজিল্যান্ড, ইংল্যান্ডের মত দলে ভিরাট কোহলি, বাবর আজম, কেন উইলিয়ামসন, জো রুটের মত প্লেয়াররা অনূর্ধ্ব-১৯ থেকে জাতীয় দলে জায়গা করে নিয়ে বিশ্ব কে তাদের সামর্থ্য যেভাবে জানান দিয়ে যাচ্ছে, তা করতে গিয়ে বারেবারেই ব্যর্থ বাংলাদেশী যুবারা। এনামুল হক বিজয়, নাজমুল হোসেন শান্ত, তাসকিন আহমেদ, আবু হায়দার রনি, সৌম্য সরকার, সাব্বির রহমান,মুমিনুল হক এরা কেউই জাতীয় দলে এসে তাদের ধারাবাহিকতা ধরে রাখতে পারেননি। বরং তাদের পারফরম্যান্স দিনকে দিন আরো নিম্নগামী হয়েছে।

সুফল পাওয়ার জায়গায় জাতীয় দল ভোগান্তি পোহাচ্ছে পূর্বের যুবাদের নিয়ে। তবে আকবর আলীর পুরো দল কে নিয়ে আশাবাদী হওয়া যায়। এই দলটার মধ্যে তিন বিভাগেই দাপুটে ক্রিকেট খেলার মত কার্যকরী ক্রিকেটার রয়েছে। বিসিবি যত পরিচর্যা করবে ততোই ওদের ভবিষ্যত উজ্জ্বল হবে। নিজেদের ব্যাপারে নিজেদের সচেতনতা বাড়ানোও তাদের দায়িত্ব। বিশ্বকাপ জয় করে তাদের দায়িত্ব আরো বেড়ে গিয়েছে।

দক্ষতা বৃদ্ধি, ফিটনেসের দিকে নজর বাড়াতে হবে। এদের হারিয়ে যেতে দেওয়া যাবেনা। অনূর্ধ্ব-১৯ থেকে উঠে এসে কোহলি-বাবর-রুটের মত ক্রিকেটার যেভাবে দ্যুতি ছড়িয়ে যাচ্ছে, ঠিক সেভাবেই দ্যুতি ছড়িয়ে ওরাই একদিন বাংলাদেশকে বিশ্ব ক্রিকেটে পরাশক্তিতে পরিণত করবে।

লেখক: ক্রিকেট সমালোচক, সাংবাদিকতা ও গণমাধ্যম বিভাগে অধ্যয়নরত শিক্ষার্থী

বাংলাধারা/এফএস/টিএম

ট্যাগ :