বাংলাদেশ, শুক্রবার, ৩ এপ্রিল ২০২০

অচল পায়ে জীবনঘানি টানছেন শুক্কুর মিয়া

প্রকাশ: ২০২০-০২-২৪ ১৬:১০:০৬ || আপডেট: ২০২০-০২-২৪ ১৬:১০:১২

ইয়াসির রাফা »

আমাদের প্রত্যেকের জীবনের একটা গল্প আছে। কঠিন বাস্তবতা মানুষকে যখন গিলে খেতে চায়, তখন অবচেতন মন পরাবাস্তবতায় আশ্রয় নিয়ে নিজেকে বাঁচিয়ে রাখে। অতীতে ফিরে গিয়ে গল্পের শুরুটা কখনো পরিবর্তন করা সম্ভব নয়, কিন্তু কঠোর পরিশ্রমের মাধ্যমে আমরা গল্পের শেষটা চাইলেই নতুন করে সাজিয়ে তুলতে পারি।

জীবনে বাস্তবতাগুলো আসলে খুবই কঠিন। চাইলেও অনেক কিছু পাওয়া সম্ভব না, আবার না চাইতেই অনেককিছু পেয়েও মানুষ অসুখী থেকে যায়। আসলে বিচিত্র মানুষ তার নিজের চাওয়া পাওয়া সম্পর্কে নিজেই হয়ত জানে না। জীবনে কষ্ট আসলে মানসিকভাবে যতটুকু আমরা ভেঙে পড়ে থাকি তাতে করে আমাদের জীবন দ্বিগুন পিছিয়ে যাবে।

জীবনের সকল দুঃখ-কষ্ট ও বাস্তবতাকে জীবনের অংশ হিসাবে মেনে নিয়ে স্বাভাবিকভাবে গ্রহণ করার নামই হচ্ছে সুখ। আজ বলবো হার না মানা এমই একজন শুক্কুর মিয়ার গল্প।

শুক্কুর মিয়া দুই সন্তানের জনক। স্ত্রী, দুই সন্তান ও পিতামাতা নিয়ে বসবাস করেন নগরীর দেবপাহাড় এলাকায়। দুটো পা অচল হলেও মনের জোর নিয়ে এগিয়ে যাচ্ছেন দুর্বার গতিতে। অথচ কত মানুষই হাত, পা সবকিছু ঠিক থাকার পরেও কাজ করে না। ভিক্ষাবৃত্তি, চুরি, সন্ত্রাসী, চাঁদাবাজির মতো নানা রকম খারাপ কাজে জড়িয়ে পরেন। কেউ হয়তো অভাবে, কেউ হয়তো স্বভাবে করে থাকেন নানা অপকর্ম। তাদের চোখেই যেন আঙুল দিয়ে দেখিয়ে দিচ্ছেন শুক্কুর মিয়া-সদিচ্ছা থাকলে মানুষ সৎ ভাবে জীবন কাটাতে পারেন।

ছবিতে যে মানুষটিকে দেখা যাচ্ছে তার দুটো পা অচল। অথচ তারপরেও নিজের পায়েই দাঁড়িয়ে আছেন। কারণ তিনি নিজের পায়ে দাঁড়াতে চেয়েছেন। কারো বোঝা হতে চাননি। নিজের হুইল চেয়ারকেই বানিয়েছেন সম্বল। চেয়ারে চিপস, চানাচুর, ডালভাজা, বন ইত্যাদি সাজিয়ে ঘুরে বেড়ান জামালখান, চেরাগী পাহাড় এলাকায়।

জীবন যাত্রা নিয়ে জিজ্ঞাসা করা হলে শুক্কুর মিয়া কাছ থেকে জানা যায়, তার একটি টঙ দোকান ছিলো নগরীর প্যারেড মাঠের পাশে। তবে অবৈধ দোকানপাঠ উচ্ছেদের সময় সে টঙ দোকান ভাঙ্গা পড়ে। ক্ষতি হয়েছে অনেক টাকা। তারপর মাথার ওপরে বিশাল ঋণের বোঝা নিয়ে প্রায় দুই মাস ঘরে বসা ছিলেন শুক্কুর মিয়া।

অভাবের সংসার টেনে নিয়েছেন গার্মেন্টস এ সামান্য বেতনে চাকুরি করা তার স্ত্রী। কিন্তু এভাবে কতদিন! শুক্কুর মিয়া তাই দশ হাজার টাকা ধার করে ক্রয় করেন একটি হুইল চেয়ার। শুরু করেন তার হুইল চেয়ারে চলমান এ দোকান। তার হুইল চেয়ারের সামনে লাল সবুজের পতাকা যেন প্রতিনিধিত্ব করছে এক হার না মানা মানুষের। এ পতাকা যেন নাড়া দিচ্ছে গোটা সমাজকে। এর মাধ্যমে যেন ধিক্কার জানানো হচ্ছে সমাজের ঘুষখোর, দুর্নীতিবাজ, প্রতারকসহ মূল্যবোধ অবক্ষয় হয়ে যাওয়া মানুষদের।

শুক্কুর মিয়ার হয়ত বিলাস বহুল বাড়ি নেই, গাড়ি নেই, নেই কোন ভোগ-বিলাসপূর্ণ জীবন। কিন্তু তারপরেও তিনি একজন বড় মাপের মানুষ। তিনি অনেক মানুষের চেয়েও বেশি বড় সম্পদ প্রশান্তির মালিক। যে সম্পদ রয়েছে তার কর্ম করার প্রয়াসে, হার না মানা গল্পে, অদম্য ইচ্ছা শক্তির মাঝে। তাই কখনো কোনো বিষয়ে অজুহাত না দেখিয়ে, আমাদের জীবনটাকে যদি আমরা সদিচ্ছা দ্বারা নিয়ন্ত্রণ করতে পারি আর সঠিক পথে কাজ করি তাহলে আমাদের জয় হবেই।

লেখক : রিপোর্টার, বাংলাধারা ডটকম

ট্যাগ :