বাংলাদেশ, বৃহস্পতিবার, ২ এপ্রিল ২০২০

শিক্ষার সংস্কৃতি যেন বোঝা না হয় শিশুদের জন্য

প্রকাশ: ২০২০-০৩-১২ ১৭:৩৪:৩৯ || আপডেট: ২০২০-০৩-১২ ১৭:৪৯:৪১

হাকিমুন নেছা বাপ্পি »

শিক্ষা শিশুর মৌলিক অধিকার, এটি কারো অজানা নয়। অথচ একদিকে অনেক কোমলমতি শিশু যেমন এ শিক্ষা থেকে বঞ্চিত হচ্ছে তেমনি অন্যদিকে শিক্ষা গ্রহণ করতে গিয়ে এ শিশুরা ভুগছে মানসিক চাপে। এর কিছু সুনির্দিষ্ট কারণও রয়েছে।

এই কোমলমতি শিশুদের আড়াই-তিন বছর হতে না হতেই অভিভাবকরা তাদের সন্তানদের ভর্তি করিয়ে দেন কিন্ডারগার্টেন স্কুলগুলোতে। আমাদের আশপাশে অলিতে গলিতে এ কিন্ডারগার্টেন গড়ে উঠেছে প্রচুর। দেশের সর্বত্র গড়ে ওঠা কিন্ডারগার্টেনগুলোর কারণে প্রাথমিক শিক্ষার মান এখন প্রশ্নের মুখে রয়েছে।

দেশ ও জাতির ভাগ্য উন্নয়নে শিক্ষায় বিনিয়োগের বিকল্প নেই। শিক্ষাই দেশের সার্বিক উন্নয়নের ভিত মজবুত করে। আর এ ক্ষেত্রে প্রাক-প্রাথমিক ও প্রাথমিক শিক্ষার ভূমিকা সর্বাপেক্ষা বেশি সে কথাও আজ ঢালাওভাবে বলার অপেক্ষা রাখে না।

প্রাথমিক শিক্ষার লক্ষ্য হলো, বিনোদনমূলক প্রাক-প্রাথমিক শিক্ষার মাধ্যমে শিক্ষার প্রতি ঝোঁক তৈরি করা। শিক্ষার্থীকে মানসিক ও শারীরিকভাবে প্রস্তুত করা, কৌশলগতভাবে শিশুদের মাঝে সামাজিকীকরণ শিক্ষাদান, শিশুদের নাচ, গান, আবৃত্তি, চিত্রাঙ্কন, গল্প বলা, গণনা ও বর্ণমালা শিক্ষার ক্ষেত্রে দক্ষতা এবং আত্মবিশ্বাস তৈরির মাধ্যমে শিক্ষার্থীর মন থেকে বই ও স্কুলভীতি দূর করা। গণস্বাক্ষরতা অভিযান ও এডুকেশন ওয়াচের প্রতিবেদনেও শিশুশিক্ষায় এসব বিষয়কে অত্যধিক গুরুত্ব দেওয়া হয়েছে।

কিন্তু দুঃখের বিষয় হলো এই কিন্ডারগার্টেন স্কুলগুলো শুরু হয় সকাল ৭-৮ টার মধ্যে। কিন্তু অভিভাবকরা বুঝতে চেষ্টা করেন না একজন শিশু এতো ভোরে উঠে রেডি হয়ে স্কুলে যেতে অনিহা প্রকাশ করেন। শিশুদের সঠিক ঘুমের রেশ কাটার আগেই অভিভাবকরা জোর করে ঘুম থেকে টেনে তুলে রেডি করাতে ব্যস্ত হয়ে পড়েন।

আসলে অভিভাবকরা বুঝতে চেষ্টা করে না যে, শিশুর সঠিক ঘুম না হলে এতে সে মানসিক বা শারীরিকভাবে কতটা ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছে। একজন লোকের দৈনিক ৮ ঘন্টা ঘুমের দরকার কিন্তু শিশুরা ভোরে স্কুলে যাওয়ার কারণে সঠিক নিয়মে তার ঘুম পূর্ণ হয় না। এতে তাদের মেজাজ থাকে খিটখিটে।

দেখা যায়, সঠিক সময়ের আগে স্কুলে পৌঁছাতে অভিভাবকদের তাড়াহুড়া ও দৌড়ঝাপ।তাড়াহুড়ো করে শিশুদের খাওয়া ও রেডি করাতে গিয়ে অভিভাবকদের না খেয়ে দৌঁড়াতে হয় শিশুকে নিয়ে স্কুলে। এছাড়া নিজেকে রেডি হতে হয়, শিশুকে রেডি করাতে হয় আবার নাস্তা ও রেডি করে সকালে খেতে হয়, শিশুকে স্কুলের টিপিন দেয়াও তাড়াহুড়ো হয়ে পড়ে।

ভোরে যখন শিশুদের ঘুমের সময়, একটু হাসিখুশিতে পরিবারের সাথে সকালে নাস্তা করার সময়, খেলার সময়, তখনই তাদের দৌঁড়াতে হয় স্কুলের উদ্দেশে।

আরেকটি বিষয় দৃষ্টিগোচর হয় প্রায়, তা হলো এমন ছোট ছোট শিশুদের গাদা গাদা বইয়ের ব্যাগের বোঝা তুলে দেয়া হয় তাদের পিঠে। আবার অভিভাবকদের মধ্যে একটা প্রতিযোগিতা শুরু হয়ে যায় শিশুকে স্কুল ফার্স্ট করাতে। তাই স্কুল থেকে আসার সাথে সাথে পড়তে বসার বাধ্য করে শিশুরদের। আবার অন্য শিশুর চেয়ে ওনার শিশু যেন রেজাল্ট ভালো করে, সেজন্যে সন্তানের জন্য গৃহশিক্ষকও রাখেন।

একটি শিশুর জীবনের প্রথম শিক্ষক তার মা আর শিক্ষাকেন্দ্র হচ্ছে তার পরিবার। অথচ অভিভাবকদের উচিৎ হলো, শিশুদের সঠিক বিকাশের জন্য, বিনোদনের জন্য তাদের সাথে একটু খেলাধুলা, ঘুরাফেরা ও তাদের কিছু ইচ্ছেকেও প্রাধান্য দেয়া। কিন্তু তা না করে অল্প বয়সে শিশুদের কিন্ডারগার্টেন স্কুলে ভর্তি করাতে দেখা যায় বেশির ভাল উচ্চ শিক্ষিত পরিবারেকে। তারা মনে করে, যত অল্প বয়সে তাড়াতাড়ি স্কুলে দিলে তাদের শিশুরা তাড়াতাড়ি বেশি শিক্ষিত হয়ে যাবেন, আসলে এ ধারণাটি ভুল।

সঠিক মানসিক বিকাশ না হলে কখনো যত শিক্ষিত পরিবার কিংবা অভিভাবক হোন না কেন আপনার, আমার শিশুদের সঠিক মানসিক বিকাশ ঘটবে না। বিশেষ করে সকালে কিন্ডারগার্টেন স্কুলগুলোর একটা প্রতিযোগিতামূলক পড়াশোনার চাপ সৃষ্টি করে কখনো সম্ভব নয়। শিশু থেকে শুরু করে পূর্ণ বয়স্কদের ক্ষেত্রে খুবই গুরুত্বপূর্ণ এই ঘুম। শরীরিক ও মানসিক বিকাশ এবং সুস্থ শরীরের জন্য এই ঘুমের প্রয়োজনীয়তা অপরিসীম।

তবে কিন্ডারগার্টেন স্কুলগুলোর সময় সকাল ৭-৮ টার মধ্যে না করে সকাল ৯-১০ টার দিকে নির্ধারণ করা অত্যন্ত জরুরি। স্কুল কমিটি, অভিভাবক ও প্রশাসনের এ বিষয়ে আর সচেতন থাকা দরকার। এতে আমার, আপনার শিশুদের সঠিকভাবে মানসিক, শারীরিক বিকাশ হবে। শিশুরাও প্রতিদিন স্কুলে যাওয়ার জন্য আগ্রহী হয়ে নিজ থেকে পড়াশোনার প্রতি দায়িত্বশীল হবেন।

একটু চিন্তা করুন, যখন কিন্ডারগার্টেন স্কুল ছিলনা তখন কি দেশে শিক্ষার প্রসার হয়নি? শিক্ষা গ্রহণ করেননি? শিক্ষক, ডাক্তার, ইঞ্জিনিয়ার, জজ, ব্যরিস্টার, গ্র্যাজুয়েশন শেষ করেননি?

আসলে আমরা শিশুদের বেশি শিক্ষিত করতে গিয়ে আমরাই ভুল করছি শিশুদের সঠিক শিক্ষা, সঠিক মানসিক বিকাশ থেকে বঞ্চিত করছি। আমরা ভুলে যাচ্ছি, শিশুদের ধর্মীয় ও নৈতিক শিক্ষা থেকে বঞ্চিত করছি। শিশুদের সঠিক শিক্ষিত করতে হলে সব বিষয়ে জ্ঞান অর্জন করা খুবই জরুরি। এতে আমার আপনার শিশুরা সঠিকভাবে শিক্ষার আলোয় আলোকিত হবেন। তাই উচিত কিন্ডারগার্টেন স্কুলগুলোর সময় সকাল ৯-১০ টার দিকে করা। এতে শিশুর সঠিক ঘুম হবে, মানসিক ও শারীরিক বিকাশ ঘটবে। এছাড়া অভিভাবকদেরও সকাল সকাল তাড়াহুড়ো ও দৌঁড়ঝাপ করতে হবে না।

লেখক : শিক্ষানবীশ আইনজীবী, কক্সবাজার জজকোর্ট

ট্যাগ :