বাংলাদেশ, রোববার, ৫ এপ্রিল ২০২০

আসুন, এই দুর্দিনে অসহায় মানুষের পাশে দাঁড়াই

প্রকাশ: ২০২০-০৩-২৩ ১৬:৪৯:৪৫ || আপডেট: ২০২০-০৩-২৩ ১৬:৪৯:৪৬

হাকিমুন নেছা বাপ্পি »

করোনায় আক্রান্তের সংখ্যা বেড়েই চলেছে। বাড়ছে এতে আক্রান্ত হয়ে মৃতের সংখ্যাও। পুরো বিশ্বের সঙ্গে করোনা আতঙ্কে ভুগছে আমাদের দেশও। দেশে ইতোমধ্যে এই রোগে মৃত্যু হয়েছে তিন জনের এবং আক্রান্ত হয়েছে সংখ্যা ৩৩। এমন পরিস্থিতিতে একের পর এক বন্ধ হয়ে গেছে স্কুল, কলেজ, বিশ্ববিদ্যালয়সহ সব শিক্ষা প্রতিষ্ঠান। এছাড়া এখন লকডাউন হতে শুরু করেছে সুপারশপ, মার্কেটও।

সম্প্রতি দেশে আসা দুই মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র প্রবাসী একটি বিয়ের অনুষ্ঠানে অংশ নেয়ার প্রেক্ষিতে গত রোববার গাইবান্ধার সদিল্লাপুর উপজেলাকে লকডাউন বা অবরুদ্ধ ঘোষণা করা হয়েছে। এর আগে মাদারীপুরের শিবচর এবং ঢাকার টোলারবাগ এলাকাও লকডাউন ঘোষণা করা হয়।

এই পর্যায়ে এমনিতেই ঢাকাসহ দেশের প্রধান শহরগুলোতে যানবাহন চলাচল কমে গেছে। তৈরি পোশাক কারখানার রপ্তানি কার্যাদেশ বাতিল হচ্ছে প্রতিদিন, কমছে উৎপাদন। কাজ কমে যাচ্ছে শ্রমজীবী মানুষের। এমনকি অনেক বেসরকারি প্রতিষ্ঠানে গত মাসের বেতন এখনো দেয়া হয়নি বলে অনেক সংবাদ মাধ্যমেও এসেছে।

অন্যদিকে শহর বা দেশ অবরুদ্ধ করার সিদ্ধান্ত নেয়া হলে প্রায় সব ধরনের অর্থনৈতিক কর্মকাণ্ড বন্ধ হয়ে যাবে। এই পরিস্থিতি দিনমজুর কিংবা নিম্নবিত্ত মানুষ কিভাবে দিনযাপন করবে!

ঢাকাসহ সারাদেশে পরিবহন খাতে যারা বাস, মিনিবাসের ড্রাইভার, সুপারভাইজার বা হেলপার হিসেবে কাজ করেন তারা মজুরি পান প্রতিদিনের ট্রিপ বা যাতায়তের ওপর ভিত্তি করে। যাত্রী ও যাতায়াত দুটিই কমে যাওয়ায় তাদের আয় কমে গেছে প্রায়। পরিবহণ বন্ধ হয়ে গেলে মালিকরা তাদের কোনো মজুরি দেবে কিনা এখনও কোন সিদ্ধান্ত আসেনি। অটোরিকশা ও রাইডশেয়ারিং-এ যারা কাজ করেন তাদের অবস্থাও নাজুক। যারা দিন মজুরের কাজ করেন তাদের হাতেও এখন তেমন কাজ নেই।

পোশাক কারখানায় ৪০লাখ কর্মী কাজ করেন। সেই খাতটিই রয়েছে সবচেয়ে বড় সংকটে৷ কারখানা মালিকরা এরই মধ্যে সরকারের কাছে অর্থসহায়তা চেয়েছেন।

বিশ্বব্যাংকের হিসেবে বাংলাদেশে প্রায় আড়াই কোটি মানুষ দারিদ্র্য সীমার নিচে বসবাস করেন। যারা দিনে আনে দিনে খায়। তার উপর রয়েছেন নিম্ন আয়ের মানুষেরা। করোনায় শুধু তারাই নন, যারা চাকরিজীবী নিম্নমধ্যবিত্ত ও মধ্যবিত্ত সবাই সংকটে আছেন।

কিন্তু সারাদেশের মানুষের জন্য বিশেষ করে যারা নিম্নমধ্যবিত্ত বা মধ্যবিত্ত তাদের নিয়ে কোনো পরিকল্পনার এখনো পর্যন্ত শুনা যাচ্ছে না। লকডাউন হলে খাদ্য বা অন্যান্য সহায়তা কিভাবে মানুষের কাছে পৌঁছানোরও কোন নিশ্চয়তা নিই।

খাদ্য এবং অন্যান্য নিত্যপ্রয়োজনীয় দ্রব্যের পর্যাপ্ততা নিশ্চিত করে সরবরাহ ব্যবস্থা গড়ে তোলা খুবই প্রয়োজন। কারণ যারা এই কাজে যুক্ত হবেন তাদের স্বাস্থ্য নিরপত্তার বিষয়টিও গুরুত্বপূর্ণ। সেটা করা না হলে লকডাউনের সময় খারাপ পরিস্থিতির সৃষ্টি হবে। বিশেষ করে নিম্নবিত্ত ও নিম্নমধ্যবিত্ত মানুষ দুর্যোগে পড়বে।

আমরা যারা বিত্তবান তারা তো শুধু লকডাউন না আরো কিছু করলেও কয়েকদিন কিংবা কয়েক মাস কাজ না করে ঠিক সংসারে সুন্দর মতো খেয়ে পড়ে দিন কাটাতে পারবে। তাদের খাবার, ওষুধ নিয়ে কোন চিন্তা নেই। কিন্তু একবারও আমরা ভেবে দেখিনি চারপাশে দিনমজুর ও অসহায় মানুষের কথা।

একটু ভাবুন, করোনা ভাইরাস থেকে বাঁচতে যা যা দরকার যেমন- মাস্ক, হ্যাডসেনিটাজাইর, ডেটল, সাবান ইত্যাদি প্রয়োজনীয় জিনিসগুলো আমরা নিজেরা কিনছি আবার নিকটাত্মীয়দেরও দিচ্ছি সচেতনতার জন্য, কিন্তু হতদরিদ্র মানুষগুলো এসব কি কিনতে পারছে? তারা কি ব্যবহার করতে পারছে এসব পণ্যগুলো? কোয়ারেন্টাইন হোমে, রাস্তায় কিংবা হাসপাতালে বিভিন্ন সংগঠন বিভিন্নভাবে হাত ধুয়ার ব্যবস্থা করেছে, কিন্তু এসব অসহায় মানুষগুলোর জন্য কেউ কি এই প্রয়োজনীয় জিনিসগুলো বিতরণ করছে?

আমি, আপনি যেমন পরিবারের জন্য এই সব পণ্যসামগ্রী ঠিক কিনে বাসায় রাখছি, কিন্তু অসহায়, হতদরিদ্ররা কি পারছে তাদের পরিবারের সঠিক সচেতনতা ও নিরাপত্তার জন্য জিনিসগুলো কিনতে? আমরা নিজেদের জীবনের চিন্তা করছি, আমাদের শিশুদের নিয়ে চিন্তা করছি কিন্তু একবারও অবহেলিত পথশিশু বা অসহায়-দরিদ্র পরিবারগুলোর কথা একবারও কি চিন্তা করেছি?

দেশের এ মহামারির মতো দুর্দিনে ধনী, গরিব সবাই এক হয়ে বাঁচার চেষ্টা বা চিন্তা করাই মানবতা, এখানেই মনুষ্যত্ববোধ। আমরা কি পারিনা, যারা সরকারিভাবে কিংবা বিত্তবান, বিভিন্ন সামাজিক সংগঠন আছি আমাদের কাজ হবে নিত্য প্রয়োজনীয় পণ্য ও ব্যবহৃত পণ্যগুলো হতদরিদ্র, অসহায় ও পথশিশুদের বিতরণ করা।

যারা দিনমজুর কাজে যেতে পারছে না, না খেয়ে আছে তাদেরকে সহযোগিতার হাত বাড়িয়ে দিতে হবে। সবাইতো মানুষ, সবার খাওয়ার, বেঁচে থাকার অধিকার আছে। আসুন এই মহামারিতে করোনাভাইরাস প্রতিরোধের পাশাপাশি দিনমজুর-অসহায় মানুষগুলোর কথা একটু ভাবি, তাদের পাশে গিয়ে দাঁড়াই।

লেখক : শিক্ষানবীশ আইনজীবী, কক্সবাজার জজকোর্ট

ট্যাগ :