বাংলাদেশ, শনিবার, ১৫ আগস্ট ২০২০

ছড়াকার সুকুমার বড়ুয়া; তীক্ষ্ণ সমাজ দৃষ্টি যার লেখায়

প্রকাশ: ২০২০-০১-০৫ ১৭:৪৮:২৪ || আপডেট: ২০২০-০১-০৫ ১৭:৫০:১৪

আশরাফুন নুর »

ছড়া বাংলা সাহিত্যের একটি প্রাচীন শাখা। সাহিত্যের বিবর্তনের সাথে সাথে ছড়ার বিকাশ ও উৎকর্ষও আমরা দেখতে পাই। প্রাচীনকালে সাহিত্য রচিত হতো মুখে মুখে আর ছড়াই হলো সাহিত্যের প্রথম শাখা এবং ভাব প্রকাশের প্রধান মাধ্যমে।

সত্য প্রকাশে কিংবা অন্যায়ের বিরুদ্ধে প্রতিবাদে ছড়াকারেরা সদাসচেষ্ট ছিলেন। ধীর্ঘকাল ধরে ‘ছেলেভুলানো ছড়া’, ‘ঘুম পাড়ানিয়া ছড়া’ ইত্যাদি ছড়া প্রচলিত হয়ে আসছে। বর্তমান বাংলাদেশের যে কয়েকজন ছড়াশিল্পী বিশেষ খ্যাতি অর্জন করেছেন, তাঁদের অন্যতম ছড়াকার সুকুমার বড়ুয়া।

সুকুমার বড়ুয়াকে গ্রামের লোকেরা বাবার দেয় ‘বিলাতী’ নামে ডাকতো। পরে মামা ডাকতেন সুকুমার। মামার বাড়ির প্রভাব বেশি থাকায় সেই থেকে নাম হয়ে গেল ‘সুকুমার’।

ছড়াকার সুকুমার বড়ুয়া ১৯৩৪ সালের ৫ জানুয়ারি চট্টগ্রামের রাউজান থানার মধ্যম বিনাজুরী গ্রামে জন্মগ্রহণ করেন। বাবা সর্বানন্দা বড়ুয়া ও মাতা কিরণ বালা বড়ুয়া। বাবা মা’র তেরোতম সন্তান তিনি।

তিনি ১৯৬৪ সালের ২১ এপ্রিল রাউজানের গহিরা গ্রামের শিক্ষক প্রতাপচন্দ্র বড়ুয়ার ননী বালার সাথে বিবাহ বন্ধনের আবদ্ধ হন। পারিবারিক জীবনে তাঁর চার সন্তান। এক ছেলে ও তিন মেয়ে।

সুকুমার বড়ুয়া মামার বাড়ির স্কুলে বর্ণজ্ঞান থেকে প্রথম শ্রেণি পর্যন্ত পড়াশোনা করেন। পরে বড় দিদির বাড়ি ডাবুয়ায় চলে যান। সেখানে ডাবুয়া স্কুলে ভর্তি হন তিনি। কিন্তু সে স্কুলে দ্বিতীয় শ্রেণি শেষ করে তৃতীয় শ্রেণিতে ওঠার পর পরই পড়ালেখা বন্ধ হয়ে যায়।

কবির বয়স যখন পাঁচ তখন দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের মর্মান্তিক কালো থাবায় জনজীবন বিপর্যস্ত। তখন এমন দিনও কেটেছে ভাতের মাড় খেয়ে দিন যাপন করতে হয়েছে কবির পরিবারকে।

খুব কম বয়েস থেকেই সুকুমার বড়ুয়া বিভিন্ন সময়ে প্রয়োজনের তাগিদে বিভিন্ন পেশার কাজ করেছেন। এক সময় তিনি চনাচুর, আইসক্রিম, বুটবাদাম, ফলমূল ইত্যাদি ফেরি করে জীবিকা নির্বাহ করতেন। পরে তিনি ঢাকায় চলে আসেন ১৯৬০ সালে।

১৯৬২ সালের ৩ ফেব্রুয়ারি ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে চতুর্থ শ্রেণির কর্মচারী হিসেবে যোগ দেন। ১৯৭৪ সালে পদোন্নতি পেয়ে তৃতীয় শ্রেণির কর্মচারী হিসেবে নিযুক্ত হন এবং ১৯৯৯ সালে তিনি ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের স্টোর কিপার হিসেবে অবসর গ্রহণ করেন।

সুকুমার বড়ুয়া ১৯৬৯ সালে গণঅভ্যুত্থানের সময় একটি ছড়া লিখে আলোচনায় চলে আসেন লেখক ও গণমাধ্যম মহলে। সেই ছড়াটি ফারসি ভাষায় অনুদিত হয়ে আকাশবাণী থেকে প্রচার হয়েছিল। লেখাটি ছিল- ‘চিচিং ফাঁক হে চিচিং ফাঁক/ বন ময়ূরের পুচ্ছ পরে/ নাচছিল সব শকুক কাক/ দমকা ঝড়ে হঠাৎ করে/ ঘটিয়ে দিলো ঘোর বিপাক/ চিচিং ফাঁক হে চিচিং ফাঁক!’

১৯৭০ সালে তাঁর লেখাগুলি পাঠানো হয় ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের বাংলা বিভাগের অধ্যক্ষ আব্দুল হাইয়ের কাছে। আব্দুল হাই একটি চিঠি লিখে তা পাঠিয়ে দিলেন কবি আলী আহসানের নিকট। ওখান থেকে ২২টি ছাড়া বাছাই করে সুকুমার বড়ুয়ার প্রথম গ্রন্থ ‘পাগলা ঘোড়া’ প্রকাশিত হয়। সেই থেকে তাঁর এগিয়ে যাওয়া শুরু।

কবি সুকুমার বড়ুয়ার প্রকাশিত গ্রন্থের মধ্যে- পাগলা ঘোড়া, ভিজে বেড়াল, চিচিং ফাঁক, এলোপাথাড়ি, চন্দনা রঞ্জনার ছড়া, নানা রঙের দিন, প্রিয় ছড়া শতক, ঠুস্ঠাস, নদীর খেলা, কিছু না কিছু, কোয়াল খাইয়ে, ছোটদের হাট, আরো আছে, ঠিক আছে ঠিক আছে, লেজ আবিষ্কার, চন্দনার পাঠশালা উল্লেখযোগ্য। তাছাড়া- মজার পড়া ১০০ ছড়া, ছড়া সমগ্র ও সুকুমার বড়ুয়ার ছড়াসম্ভার ইত্যাদি গ্রন্থও প্রকাশিত হয়।

এই ছড়াশিল্পী সুকুমার বড়ুয়া অনেক সংবর্ধনা ও সম্মাননায় ভূষিত হয়েছেন। তাঁর প্রাপ্ত পুরস্কারের মধ্যে ১৯৭৭ সালে বাংলা একাডেমী পুরস্কার, বাংলাদেশ শিশু একাডেমী সাহিত্য পুরস্কার, আলাওল সাহিত্য পুরস্কার, ঢালী মনোয়ার স্মৃতি পুরস্কার, বৌদ্ধ একাডেমী পুরস্কার, অগ্রণী ব্যাংক সাহিত্য পুরস্কার, চোখ সাহিত্য পুরস্কার, অবসর সাহিত্য পুরস্কার, কবীর চৌধুরী সাহিত্য পুরস্কার, চন্দ্রাবতী শিশুসাহিত্য পুরস্কার ও একুশে পদক (ভাষা ও সাহিত্যে) উল্লেখযোগ্য।

এছাড়াও তিনি লেখিকা সংঘ সাহিত্য পদক, শব্দপাঠ পদক, চট্টগ্রাম প্রেসক্লাব সম্মাননা, রাউজান ক্লাব সংবর্ধনাসহ আরো অসংখ্য সংবর্ধনা, সম্মাননা ও পুরস্কার অর্জন করেন।

কিংবদন্তী সুকুমার বড়ুয়ার আজ ৮১ তম জন্মবার্ষিকী। সাহিত্যের এ উজ্জ্বল নক্ষত্রের জন্মদিনে তাঁর প্রতি জানাই ভালোবাসা। কবি আরো অনেক বছর আমাদের মাঝে বেঁচে থাকবেন এ কামনাই করি।

লেখক : সহ-সম্পাদক, বাংলাধারা ডটকম।

ট্যাগ :

close