বাংলাদেশ, ১লা ডিসেম্বর, ২০২০ খ্রিস্টাব্দ | ১৬ই অগ্রহায়ণ, ১৪২৭ বঙ্গাব্দ

বেকারত্ব ঘুচিয়ে দেশকে এগিয়ে নিতে তরুণ উদ্যোক্তারাই ভরসা : রাইসুল উদ্দিন সৈকত 

প্রকাশ:১লা ডিসেম্বর, ২০২০ খ্রিস্টাব্দ

মরণঘাতী নভেল করোনাভাইরাস (কভিড-১৯) সব ধরনের ভবিষ্যদ্বাণীকে বুড়ো আঙুল দেখিয়েছে। যার ভয়াল থাবায় চরম ঝুঁকিতে পড়েছে বাংলাদেশও। সবচেয়ে ঝুঁকিতে পড়বে সেবা খাত, পর্যটন, পরিবহন ও খুচরা কেনাবেচার ব্যবসা। শুধু মানুষের জীবন ও স্বাস্থ্য নয়, তাদের জীবিকার উপরও থাবা বসিয়েছে। এই ভাইরাসটি বিশ্ব অর্থনীতিতে ইতোমধ্যে বড় ধরনের ঝাঁকুনি দিয়েছে। এখন পর্যন্ত বিভিন্ন দেশের অর্থনীতিতে যে প্রভাব ফেলেছে, তাতেই চাকরি হারাবেন আড়াই কোটি মানুষ। আর এর মধ্যে মধ্যপ্রাচ্যে হারিয়ে যাবে ১৭ লাখ চাকরি। চাকরি হারানোর কারণে বিশ্বে নতুন করে সাড়ে ৩ কোটি মানুষ দারিদ্রসীমার নিচে নেমে যেতে পারে।

আন্তর্জাতিক বিশ্লেষকদের মতে, করোনার প্রভাবে বাংলাদেশে দু’ভাবে বেকারত্ব বাড়বে। (এক) দেশের ভেতরে অসংখ্য মানুষ চাকরি হারাবে। (দুই) মধ্যপ্রাচ্যে কর্মরত বিপুল সংখ্যক বাংলাদেশি বেকার হয়ে পড়বে।

করোনা পরবর্তী সময়ে বাংলাদেশকে এগিয়ে নেয়া এবং বেকারত্ব ঘোচাতে তরুণ উদ্যোক্তারা কি ভাবছেন তা জানতে আজ আমরা কথা বলবো জুনিয়র চেম্বার ইন্টারন্যাশনাল (চিটাগাং কসমোপলিটন) এর প্রাক্তন প্রেসিডেন্ট ও এলবিয়ন গ্রুপের চেয়ারম্যান রাইসুল উদ্দিন সৈকতের সাথে। এই তরুণ উদ্যোক্তার সাক্ষাৎকারটি নিয়েছেন ‘বাংলাধারা’র প্রধান প্রতিবেদক তারেক মাহমুদ। 

বাংলাধারা : করোনা পরবর্তী সময়ে বাংলাদেশকে এগিয়ে নিতে তরুণদের কি ভুমিকা থাকা উচিত? 

রাইসুল উদ্দিন সৈকত : আমি মনে করি তরুণরাই পারে বাংলাদেশকে এগিয়ে নিতে। আমরা সেই ৫২ ভাষা আন্দোলন থেকে শুরু করে ৭১ মহান মুক্তিযুদ্ধ স্বৈরাচার বিরোধী আন্দোলনে তরুণদের ভূমিকা অনস্বীকার্য। সুতরাং ২০২০ সালের এই সংকট উত্তরনে তরুণদের ভূমিকা অবশ্যই সামনের কাতারে থাকবে। তবে তরুণ উদ্যোক্তদের পাশে দাঁড়ানোর জন্য সরকারের পাশাপাশি বিত্তবান ও ব্যবসায়ী শিল্প প্রতিষ্ঠানের মালিকগুলোকে এগিয়ে আসতে হবে। কারণ করোনা পরবর্তী বেকারত্ব ঘুচিয়ে দেশকে এগিয়ে নিতে তরুণ উদ্যোক্তারাই হবে একমাত্র ভরসা। 

বাংলাধারা : তরুণ উদ্যোক্তা হিসাবে আপনি বিষয়টা কিভাবে দেখছেন? 

রাইসুল উদ্দিন সৈকত : যেই উদ্যোক্তারাই ঝুঁকি নিয়ে যেভাবে কাজ করে সফলতার ধারপ্রান্তে নিয়ে যায় তারাই অসাধারণ ব্যক্তি। এই অসাধারণ ব্যক্তিরাই দেশের উন্নয়নে ভূমিকা রাখতে পারে। দারিদ্র্যতার এই সময়ে উদ্যোক্তারা যথাযথ পদক্ষেপ গ্রহণ করলে দারিদ্র্যতামুক্ত সমাজ গঠন করা সম্ভব হবে। বেকারত্ব দূর করার জন্য সফল উদ্যোক্তাদের ভূমিকা অনেক বেশী। দেশের অর্থনীতিকে আবার সচল রাখার জন্য তরুণ উদ্যোক্তাদের এগিয়ে আসতে হবে। 

বাংলাধারা : করোনাভাইরাস  মোকাবেলায় বাংলাদেশ কতটুকু প্রস্তুত এ নিয়ে কিছু বলুন? 

রাইসুল উদ্দিন সৈকত : করোনার ভয়াবহ ছোবল ইতোমধ্যে সমগ্র বিশ্বকে স্তব্ধ করে দিয়েছে। চীন, ইতালি, ফ্রান্স, যুক্তরাষ্ট্র, যুক্তরাজ্য, ইরান, স্পেনসহ অবকাঠামো ও স্বাস্থ্য খাতে উন্নত অনেক দেশকেই মৃত্যুপুরীতে পরিণত করেছে।আমরা যদি ইউরোপ-আমেরিকার মতো পরিস্থিতিতে পৌঁছাই, তাহলে আমরা এটিকে কোনোভাবেই নিয়ন্ত্রণ করতে পারব না। এটা কীভাবে ছড়াচ্ছে সেটা অজানা। আমরা যে ধরনের প্রস্তুতিই নিই না কেন, যখন এটি একেবারে চূড়ান্ত মাত্রায় সংক্রমণ ঘটাবে তখন কী ঘটবে সেটা ভেবেই আঁতকে উঠি। আমাদের কাছে প্রয়োজনীয় শয্যা, ভ্যান্টিলেটর, পিপিইর এক চতুর্থাংশও নেই। এসব কিছুই দরকার। বর্তমানে আমরা কেউই নিরাপদে নেই, নিউ ইয়র্কের অবস্থা দেখুন যেখানে সব ধনী মানুষের বসবাস, তবুও তারা করোনা প্রতিরোধ করতে পারছে না। করোনা পরবর্তীতে কী পরিস্থিতি তৈরি হবে এই নিয়ে শঙ্কা তৈরি হয়েছে। অবশ্য জনগণকে রক্ষা করার জন্য এরইমধ্যে সাধ্যমত সব ব্যবস্থা নিয়েছে সরকার। আমাদের মাননীয় প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা মহামারি করোনাভাইরাসের কারণে সৃষ্ট অর্থনৈতিক মন্দাবস্থা মোকাবিলায় মোট পাঁচটি প্যাকেজে প্রায় ৭৩ হাজার কোটি টাকার আর্থিক সহায়তা ঘোষণা করেছেন।  ইতোমধ্যে আপনারা জেনেছেন দেশে করোনাভাইরাসের প্রাদুর্ভাব মোকাবিলায় পুলিশ, সশস্ত্র বাহিনী, মাঠ প্রশাসন, ডাক্তারসহ যারা সেবা করছেন তাদের জন্য স্বাস্থ্যবীমার ঘোষণা দিয়েছেন প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা। পদ মর্যাদা অনুযায়ী এই স্বাস্থ্যবীমা হবে ৫ থেকে ১০ লাখ টাকার। 

বাংলাধারা : করোনাভাইরাসের চিকিৎসা সেবা নিয়ে আমরা কতটুকু অগ্রসর হয়েছি? 

রাইসুল উদ্দিন সৈকত : চিকিৎসার প্রধান সারঞ্জামের মধ্যে প্রথমেই ডাক্তারদের জন্য অবশ্যই পারসোনাল প্রটেক্টিভ ইক্যুইপমেন্ট (পিপিই) ব্যবস্থা করা। এমনিতেই আমাদের দেশে চিকিৎসকের অভাব। প্রতি ১৮৫০ জনে মাত্র একজন ডাক্তার। নার্স আছে প্রতি ১০ হাজারে দুইজনেরও কম। সব মিলিয়ে প্রায় ৯০ হাজার ডাক্তার আর ৩৫ হাজার নার্সের এ সীমিত আয়োজন। করোনাভাইরাসের বয়স ৩ মাস অতিক্রম করে গেছে। অথচ আমরা ডাক্তারদের নিরাপত্তার কথাটা মাথায়ই নেইনি। এটি একটি বড় ধরনের দুর্বলতা।

বাংলাধারা : করোনাভাইরাসের কারণে হাজার হাজার কোটি টাকার ক্ষতির আশঙ্কা বাংলাদেশের শিল্প ও বাণিজ্যে বিষয়টি কিভাবে দেখছেন? 

রাইসুল উদ্দিন সৈকত : করোনাভাইরাসের কারণে চীনের সাথে পণ্য আনা-নেয়া ব্যহত হওয়ায় দেশটির সঙ্গে বাংলাদেশের বাণিজ্যে ব্যাপক ক্ষতির আশংকা করা হচ্ছে। বিশেষ করে তৈরি পোশাক, চামড়া ও চামড়াজাত পণ্য, ওষুধ শিল্প এবং ইলেক্ট্রনিক্সসহ মোট ১৪টি খাত চিহ্নিত করে সরকারকে এক রিপোর্ট পাঠিয়েছে বাংলাদেশ ট্রেড অ্যান্ড ট্যারিফ কমিশন। যাতে বলা হয়েছে চীনের সঙ্গে আমদানি ও রপ্তানি উভয় খাতে আর্থিক ক্ষতির আশংকা রয়েছে।

বাংলাধারা : কোন খাতে কেমন ক্ষতির আশংকা বলে মনে করেন? 

রাইসুল উদ্দিন সৈকত : চীনের সঙ্গে বাংলাদেশের কোন কোন খাতে ৮৫ শতাংশ পর্যন্ত বাণিজ্য হয়ে থাকে। যার মধ্যে তৈরি পোশাকের মধ্যে নিট খাতের ডাইং ও কেমিক্যাল এবং অন্যান্য অ্যাক্সেসরিজের ৮০-৮৫ শতাংশ আমদানি নির্ভর এবং সেগুলো চীন থেকে আসে। এর বাইরে ওভেন খাতের ৬০ শতাংশ আসে চীন থেকে। গার্মেন্টস অ্যাক্সেসরিজ, প্যাকেজিং খাতে চার বিলিয়ন ডলারের কাঁচামাল দরকার হয়, এ খাতে প্রায় দেড় হাজার কোটি টাকা ক্ষতির আশংকা করা হচ্ছে। বাংলাদেশ ট্রেড অ্যান্ড ট্যারিফ কমিশনের একটি রিপোর্ট থেকে জানতে পেরেছি, ভোগ্যপণ্যের মধ্যে ১৭টি নিত্যপ্রয়োজনীয় পণ্য যেমন রসুন, আদা, লবণ, মসুর ডাল, ছোলা, দারুচিনি, লবঙ্গ, এলাচ আমদানি হয় চীন থেকে। ফিনিশ লেদার ও লেদার গুডস অর্থাৎ চামড়া ও চামড়াজাত পণ্যের জন্য আঠা, ধাতব লাইনিং ও অ্যাক্সেসরিজের ৬০ শতাংশ আমদানি হয় চীন থেকে। এখাতে তিন হাজার কোটি টাকার মত ক্ষতি হবে। বাংলাদেশ থেকে সামুদ্রিক মাছ অর্থাৎ কাঁকড়া ও কুচে মাছ রপ্তানি হয়, এর ৯০ শতাংশই যায় চীনে। এদিকে ইলেকট্রিক্যাল, মার্চেন্ডাইজ ম্যানুফ্যাকচারিং শিল্পের ৮০-৮৫ শতাংশ যন্ত্রাংশ ও কাঁচামাল চীন থেকে আসে। পাট স্পিনিং খাতে প্রতি বছর বাংলাদেশ চীনে পাট ও পাটজাত পণ্য ৫৩২ কোটি টাকার রপ্তানি করে। করোনাভাইরাসের কারণে এখন ক্ষতির পরিমাণ কত হবে তা নিরূপণের কাজ চলছে। মেডিক্যাল ইনস্ট্রুমেন্টস ও হসপিটাল ইকুয়িপমেন্ট তৈরি শিল্পের যন্ত্রাংশ চীন থেকে আমদানি হয়। কসমেটিক্স অ্যান্ড টয়লেট্রিজ খাতে প্রতি মাসে ৭৫ কোটি টাকা মূল্যের পণ্য আমদানি হয়, যা এখন বন্ধ রয়েছে।এছাড়া ওষুধ শিল্পের কাঁচামাল এবং চশমা শিল্পের বাজারও চীন নির্ভর। আমি মনে করি এসব জায়গায় সরকারকে নজর দিতে হবে।

বাংলাধারা : করোনা সংকটের আবর্তে ঘুরপাক খেয়ে দেশের অর্থনৈতিক অবস্থা দন্যদশায় নিমজ্জিত হবে কথাটি কতটুকু যৌক্তিক বলে মনে করেন? 

রাইসুল উদ্দিন সৈকত : করোনাভাইরাসে আমাদের প্রধান রফতানিখাত পোশাকশিল্প সবেচেয় ক্ষতির মুখে পড়েছে। দেশের আমদানি-রপ্তানি বন্ধ।  ইতোমধ্যে ৯০ ভাগ শিল্প-কারখানা বন্ধ ঘোষণা করা হয়েছে। অবস্থা যেদিকেই এগিয়ে যাক, তা থেকে পরিস্থিতির উন্নতি ঘটাতে হবে। ইতোমধ্যে বিশ্বেনেতা-রাষ্ট্রনায়ক প্রধানমন্ত্রী জাতির উদ্দেশে ভাষণে রফতানি খাতের জন্য ৫ হাজার কোটি টাকা প্রণোদনা দেওয়ার ঘোষণা করেন। এতে রফতানিখাত ঘুরে দাঁড়ানোর সুযোগ পাবে বলে আমরা দৃঢ়ভাবে বিশ্বাস করি। পরিস্থিতি বিবেচনায় সরকার প্রধান হয়তো পরবর্তী সময়ে আরো প্রণোদনার বিষয়টি বিবেচনা করবেন। দেশে আজ বিশ্বে দরবারে যেভাবে মাথা তুলে দাঁড়িয়েছে, তা সম্পূর্ণতই বিশ্বনেতা-প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার বলিষ্ট রাষ্ট্র পরিচালনার ফলেই। 

বাংলাধারা : করোনাভাইরাস মোকাবেলায় নিরাপদ দুরত্ব ও সচেতনতার বিষয়ে কিছু বলুন..

রাইসুল উদ্দিন সৈকত : আমাদের প্রথম কাজ হচ্ছে নিজেদের ব্যাপারে সচেতন থাকা। তারপর প্রত্যেককে এ ব্যাপারে সচেতন করতে হবে। আমাদের মনে রাখা উচিত বলে মনে করি যে, প্রাণঘাতী করোনা সংক্রমণ বিস্তাররোধে সচেতনতার পরিচয় তুলে ধরাই আসল কাজ।

বাংলাধারা : এ অবস্থায় দেশের ধনাঢ্য ও বিত্তশালীদের এগিয়ে আসাটাকে কিভাবে দেখছেন?

রাইসুল উদ্দিন সৈকত : দেশের প্রতিষ্ঠিত অনেক শিল্পপতি এবং শিল্পপ্রতিষ্ঠান দেশের এই ক্রান্তিকালে তারা এগিয়ে এসেছে। বাড়িয়ে দিয়েছে সাহায্যের হাত। জাতির ক্রান্তিকালে তাদের এগিয়ে আসাটা অবশ্যই জাতি কৃতজ্ঞচিত্তে মনে রাখবে। গণমাধ্যমগুলো জানিয়েছে- বসুন্ধরা, বেক্সিমো গ্রুপের মতো অনেক শিল্পগোষ্ঠী প্রধানমন্ত্রীর ত্রাণ ও কল্যাণ তহবিলে উল্লেখযোগ্য পরিমাণ অর্থসহায়তা দিয়েছে। অবশ্যই এটি দরকার আছে। 

বাংলাধারা : করোনা ক্রান্তিলগ্নেও সচল ‘ডিজিটাল বাংলাদেশ’ কথাটি কতটুকু যৌক্তিক বলে মনে করেন? 

রাইসুল উদ্দিন সৈকত : শুধুমাত্র ডিজিটাল বাংলাদেশ হওয়ার কারণেই তথ্য প্রযুক্তি ব্যবহার করে মানুষ কাজ করে যেতে পারছে। এ কারণে করোনা ভাইরাসের ক্রান্তিলগ্নেও দেশকে সচল রাখতে ভূমিকা রাখায় প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা এবং তার তথ্য ও প্রযুক্তি বিষয়ক উপদেষ্টা সজীব ওয়াজেদ জয়ের প্রতি বিশেষ কৃতজ্ঞতা প্রকাশ করছি। 

বাংলাধারা : এতক্ষণ মুল্যবান সময় দেয়ার জন্য আপনাকে ধন্যবাদ। 

রাইসুল উদ্দিন সৈকত : আপনাকে ও বাংলাধারাকে ধন্যবাদ জানাই। সেই সাথে বাংলাধারার সকল পাঠক ও শুভানুধ্যায়ীদের উদ্দেশ্যে বলবো ঘরেই থাকুন, সুস্থ থাকুন। সরকারি নির্দেশনা মেনে চলুন। 

বাংলাধারা/এফএস/টিএম

ট্যাগ :

close