বাংলাদেশ, বুধবার, ৫ আগস্ট ২০২০

বেসরকারি চিকিৎসা ব্যবস্থার বেহাল দশা, এই দায় কার?

প্রকাশ: ২০২০-০৬-১৪ ১৯:৫৮:৩৮ || আপডেট: ২০২০-০৬-১৫ ১৩:০৭:৫৮

ইয়াসির রাফা »

বাংলাদেশে প্রথম করোনা রোগী ৮ মার্চ শনাক্ত হওয়ার ২৬ দিন পর চট্টগ্রামে প্রথম করোনা রোগীর দেখা মেলে। এর ঠিক ৭০ দিনের মাথায় চট্টগ্রামে করোনা পজিটিভ শনাক্ত হওয়া রোগীর মোট সংখ্যা দাঁড়ালো ৫ হাজার ৮৪ জন। শুধু আক্রান্তের দিক থেকে নয়, মৃতের তালিকার শীর্ষেও উঠে এসেছে চট্টগ্রাম বিভাগের নাম।

চট্টগ্রামে প্রতিদিনই বাড়ছে মৃত্যুর সংখ্যা। বেসরকারি হাসপাতালগুলোতে চিকিৎসা সেবা এবং ব্যবস্থাপনা নিয়ে সাধারণ মানুষের অভিযোগের কোন কমতি নেই। নগরীর বেসরকারি হাসপাতালে আইসিইউ শয্যা থাকলেও মিলছে না সেগুলোতে মানুষের সেবা। একই সাথে ওষুধ ও অক্সিজেনের অতিরিক্ত দামের বিষয় নিয়ে প্রতিনিয়তই সংবাদ ও মানুষের আহাজারির চিত্র দেখতে পাওয়া যাচ্ছে।

দেশের এমন সংকটকালেও বেসরকারি হাসপাতালগুলোতে চিকিৎসা সেবা এবং ব্যবস্থাপনা নিয়ে প্রশ্ন উঠছে। অনেক রোগী অভিযোগ করেছেন,শ্বাসকষ্ট, জ্বর, সর্দি-কাশির মতো লক্ষণ থাকলেই এসব হাসপাতালে হাসপাতালে ঘুরেও রোগের চিকিৎসা পাওয়া যাচ্ছে না। নানা অজুহাতে ফিরিয়ে দেয়া হচ্ছে রোগী। সেবা খাত থেকে যদি সেবাই না পাওয়া যায় তবে তার পরিচয় কিসে?

কোনো বেসরকারি হাসপাতাল বা ক্লিনিক চিকিৎসা না দিলে সরকারের পক্ষ থেকে হুঁশিয়ারি দেওয়া হয়েছে লাইসেন্স বাতিলসহ বিভিন্ন ব্যবস্থা নেয়া হবে। কিন্তু সুনির্দিষ্ট গাইডলাইন এবং সমন্বয় ছাড়া শুধু হুমকি দিয়ে পরিস্থিতির উন্নতি করা যাবে না বলেছেন হাসপাতাল মালিকরা।

তবে কি সে পর্যন্ত সাধারণ মানুষেরা এভাবে চিকিৎসা পাবার জন্য হাসপাতালের দ্বারে দ্বারে ঘুরে বেড়াতে থাকবে? পেটে অনাগত বাচ্চা নিয়ে যে মেয়েটি দিনভর ঘুরলেন হাসপাতালে-হাসপাতালে। টানা ১৮ ঘন্টা চেষ্টা করেও পুরো চট্টগ্রামে মেলেনি যার জন্য একটি আইসিইউ (নিবিড় পরিচর্যা কেন্দ্র)। মাত্র এক সপ্তাহ পর যে শিশুর পৃথিবীর আলো দেখার কথা ছিলো , সে কবরস্থানে মায়ের সঙ্গী হল- এইসব হিসাব কিভাবে চুকাবো আমরা?

প্রশ্ন আসতে পারে সরকারি হাসপাতাল থাকা সত্বেও বেসরকারি হাসপাতাল বা ক্লিনিকের আধিপত্য কেন বেড়েছে এ দেশে। নগরীর আন্দকিল্লা এলাকার বাসিন্দা ওমর ফারুক প্রায়শই বিভিন্ন সময় ছোট-খাটো সমস্যা নিয়ে চিকিৎসকের শরণাপন্ন হন। তিনি জানান, সরকারি হাসপাতালগুলোতে স্বাভাবিক সময়ে সেবার জন্য লম্বা লাইন ধরতে হয়। পরিবেশও তেমন ভাল নয়।

এছাড়া সরকারি হাসপাতালে চিকিৎসা নিতে গেলে অধিকাংশকে শারীরিক পরীক্ষা করাতে হয় বেসরকারি হাসপাতাল কিংবা ডায়াগনস্টিক সেন্টার থেকে। অন্যদিকে বেশিরভাগ সময় দেখা যায়, ডাক্তাররা চেম্বার করেন বেসরকারি হসপিটালে। তাই সব মিলিয়ে যাদের আর্থিক অবস্থা কিছুটা ভালো তারা বেসরকারি হসপিটালেই যেতে চান।

অর্থাৎ, আমাদের দেশের স্বাভাবিক পরিস্থিতিতে স্বাস্থ্য ব্যবস্থায় বেসরকারি হাসপাতাল বা ক্লিনিকের দাপট বেশ জোরালো। তাই যাদের আর্থিক অবস্থা ভালো তারা বেসরকারি হাসপাতালকেই ‘প্রেফার’ করে এসেছেন এতদিন। অন্যদিকে সরকারি হাসপাতালগুলো জনসাধারণের কাছে নাম পেয়েছে ‘গরীবের হাসপাতাল’ হিসেবে !

মানুষ যখন জান বাঁচাতে বিভিন্ন হাসপাতালে ছুটোছুটি করছে, ঠিক সেই সময়ে বহু বেসরকারি হাসপাতাল রোগীদের চিকিৎসা দেবার ক্ষেত্রে টালবাহানা করছে। যার প্রমাণ আমরা গণমাধ্যমের বিভিন্ন প্রকাশিত সংবাদের মাধ্যমে পেয়েছি ও পাচ্ছি। বেসরকারি খাতের উপর অতি নির্ভরশীলতা যে ভালো নয় সেটি প্রমাণ হয়েছে এবার কোভিড-১৯ মহামারির সময়।

বিশেষজ্ঞরা অনেকেই মনে করেছন, এ অবস্থা তৈরি হয়েছে বেসরকারি খাতের উপর অতি নির্ভরশীলতার কারণেই। একটি দেশের স্বাস্থ্য খাতকে সে দেশের সরকার কতটা গুরুত্ব দেয় সেটি বোঝা যায় স্বাস্থ্যখাতে কত টাকা খরচ করছে তার উপর ভিত্তি করে।

সরকারি হাসপাতালের সংখ্যা বৃদ্ধির পাশাপাশি ব্যবস্থাপনার মান উন্নত করে বেসরকারি খাতের ওপর নির্ভরশীলতা কমানো সম্ভব। তবে সেক্ষেত্রে মান ও পরিবেশ নিশ্চিত করতেই হবে। নতুবা অদূর ভবিষ্যতে আজকের দিনের চেয়েও খারাপ অবস্থার মুখোমুখি হতে হবে।

লেখক : প্রতিবেদক , বাংলাধারা ডটকম

ট্যাগ :

close
bangladhara ads