বাংলাদেশ, শনিবার, ২৬ সেপ্টেম্বর ২০২০

জননী পাগল এক ছেলের ২২ বছর অপেক্ষা

প্রকাশ: ২০২০-০৮-০৯ ২০:০৮:১৩ || আপডেট: ২০২০-০৮-০৯ ২০:০৯:১৩

জালালউদ্দিন সাগর »

আওয়ামী লীগের সভাপতি বঙ্গবন্ধু কন্যা শেখ হাসিনার পা ছুঁয়ে সালাম করতে প্রায় ২২ বছরের অধিক সময় প্রতিক্ষা করছেন ১৯৯৯ সালের ১৫ মে চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয় (চবি) ক্যাম্পাসে ছাত্র শিবিরের সন্ত্রাসীদের হামলায় প্রায় পঙ্গু হওয়া (বর্তমানে মানসিক ভারসাম্যহীন) চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়ের শাহজালাল হলের ছাত্রলীগের প্রথম নির্বাচিত প্রেসিডেন্ট ফিন্যান্স ডিপার্টমেন্টের (এমবিএ) ছাত্র আবুল কালাম আজাদ।

আহত হওয়ার পর ভারতের চেন্নাই ও বাংলাদেশের বিভিন্ন হাসপাতালে প্রায় তিন বছর চিকিৎসা নিয়ে ২২ বছরেরও পুরোপুরি সুস্থ হতে পারেন নি রাঙ্গামাটি জেলার কাপ্তাইস্থ চন্দ্রঘোনা কর্ণফুলী পেপার মিলস হাইস্কুলের মেধাবী এই ছাত্র।

ছাত্র শিবিরের হায়েনাদের হাতে আহত আবুল কালাম আজাদে বেঁচে থাকার আশা ছেড়েই দিয়েছিলেন চট্টগ্রাম মেডিকেল কলেজ হাসপাতালের চিৎিকৎসকরা। বুকে পানি জমার কারণে বুক ফুলে এক হাত উঁচু হয়ে গিয়েছিল তার। চমেকের চিকিৎসকরা বললেন, বাঁচবেন না!

চিকিৎসকদের আবাক করে দিয়ে মিরাকেলি বেঁচে আছেন আজাদ। মুক্তিযুদ্ধের পক্ষে কথা বলতে গিয়ে, বঙ্গবন্ধুর গল্প শুনাতে গিয়ে, শেখ হাসিনাকে জননী ডাকার অপরাধে আজাদের যে বুক ফুঁটো করেছিল শিবির নামক হায়েনার দল, সেই বুকে ছোট একটি স্বপ্ন লালন করে এখনো বেঁচে আছেন আজাদ।

প্রায় মানসিক ভারসাম্যহীন সে আজাদের বুকে ছোট একটি স্বপ্ন-পৃথিবী থেকে বিদায় নেওয়ার আগে মায়ের (শেখ হাসিনা) পা ধরে একবার সালাম করতে চান চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয় ছাত্রলীগের দুঃসময়ের কাণ্ডারি আবুল কালাম আজাদ।

সম্প্রতি আজাদের বড় বোন চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়ের ব্যবস্থাপনা বিভাগের অধ্যাপক ড. সেলিনা আখতারের সাথে কথা হয়। আজাদের কথা জিজ্ঞেস করতেই দু’চোখ ছলছল করে ওঠে তাঁর। তর্জনী দিয়ে চোঁখের পানি আলগা করতে গিয়ে বিপাকে পরেন আরও। প্লাবন কী অঙুল দিয়ে ঠেকানো যায়? -বলেন সেলিনা আখতার।

১৯৯৯ সালের ১৫ মে। আমি বর্তমান আর্টস বিল্ডিং এর নিচতলায় (ব্যবস্থাপনা বিভাগের একটি কক্ষ ছিল) থার্ড ইয়ারের পরীক্ষার দায়িত্বে ছিলাম। আজাদের এক সহপাঠী এসে বললো, ফিন্যান্স ডিপার্টমেন্টের করিডোর থেকে আজাদকে তুলে নিয়ে গেছে শিবিরের ছেলেরা। পরীক্ষার হল থেকে আমি দৌড়ালাম। ভাইকে যে বাঁচাতে হবে! দশ-বারোজন মিলে হাতুড়ি দিয়ে বুকটাকে থেতলে দিয়েও ক্ষান্ত হয়নি অমানুষগুলো। ইলেকিট্রক ড্রিল মেশিন দিয়ে হাঁটু, বুকসহ শরীরের বিভিন্ন জায়গায় ছিদ্র করে আজাদকে মৃত প্রায় ফেলে গেছে রাস্তার ওপরেই।- যোগ করেন সেলিনা আখতার।

আরও বলেন, প্রায় মৃত অবস্থায় আজাদকে উদ্ধার করে চমেকে যাই। বুকে পানি জমে বুক ফুলে এক হাত উঁচু হয়ে গিয়েছিল তার। দেখে, পরীক্ষা-নিরীক্ষা করে ডাক্তাররা বললেন, বাঁচবে না আজাদ! তবুও আমি আশা ছাড়িনি। ভাইকে যে বাঁচাতেই হবে- এই কথা বলেই হু হু করে আবারও কাঁদতে শুরু করলেন তিনি।

ড. সেলিনা আখতার। চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়ের ব্যবস্থাপনা বিভাগের সাবেক অধ্যাপক তিনি। ভুলে গেলেন নিজের অবস্থান। নিজের পরিচিতি। ভাইয়ের ভালোবাসা, স্নেহ আর মমতার কাছে পৃথিবীর বাকি সব কিছু নস্যি তাঁর কাছে।

সেই বছর সেপ্টেম্বরের দিকে ভারতের চেন্নাইয়ের এপোলো হাসপাতালে নিয়ে গেলাম আজাদকে। ডাক্তাররা বললেন, ফুসফুসে পানি জমাতে পুরোটাই ক্যান্সারে পরিণত হয়ে গেছে। অপারেশন ছাড়া গতি নেই। জানালেন সেলিনা আখতার।

অপারেশন করা হলো আজাদের। এরপর ডাক্তাররা বললেন, আজাদকে ছয়টি কেমোথেরাপি দিতে হবে। সে সময়ে বাংলাদেশে কেমো শুরু হয়নি। তাই চেন্নাইয়ে ছয় মাস থেকে ছয়টি কেমোথেরাপি দেয়া হলো তাকে। রেডিওথেরাপিও দেয়া হলো। তিনটা কেমোথেরাপি দেয়ার পর পুরোপুরি পাগল হয়ে গেলে আজাদা। উল্টো স্যান্ডেল পড়ে, উল্টো প্লেটে ভাত খায়। উল্টা শার্ট পড়ে।- বলেন সেলিনা আখতার।

চেন্নাই থেকে ফিরে চট্টগ্রাম মেডিকেল কলেজের নিউরোসার্জন ইউনিটে ভর্তি করালাম। হাসপাতালে থেকে সারারাত জেগে পাহারাা দিতে হতো। খবর পেয়েছিলাম, শিবিরের সেই সন্ত্রাসীরা হাসপাতালে তার ওপর আবারও হামলা চালাবে। দীর্ঘ মাস হাসপাতালে চিকিৎসা হলো। সে চিকিৎসা এখনো চলছে। মনোরোগ বিশেষজ্ঞ শাহ আলমের তত্ত্বাবধানে এখনো চিকিৎস চলছে আজাদের।- যোগ করেন সেলিনা আখতার।

সেলিনা আখতার আরও বলেন, আজাদকে আমি একদিন জিজ্ঞেস করেছিলাম, এই রাজনীতি করে তুই কী পেলি? আজাদ উত্তর দেয়, মা। শেখ হাসিনা আমার মা-তো। মায়ের জন্য আমি সব পারি।

সেলিনা আখতার বলেন, আমার ভাইয়ের একটিই স্বপ্ন বঙ্গবন্ধু কন্যা শেখ হাসিনাকে একটিবার পায়ে ধরে সালাম করতে চায় সে! আমি জানিনা আমার মানসিক ভারসাম্যহীন ছোটভাইয়ের স্বপ্ন পূরোন হবে কিনা। যোগ করেন সেলিনা।

কতজনের কত স্বপ্নই তো পুরোন করেন জননী। আমার ভাইয়ের ছোট এই স্বপ্নটি কোনো একদিন হয়তো পুরোন করবেন জননী-বুকভরা এমন আশা নিয়েই এখনো বেঁচে আছে আজাদ।- বলেন ড. সেলিনা আখতার।

চট্টগ্রা বিশ্ববিদ্যায়ের সাবেক ছাত্র ছাত্রলীগের সহকর্মী মো. দিদার জানান, যে সময়ে আজাদ ভাইয়ের ওপর লোমহর্ষক হামলা চালানো হয় সে সময়ে চট্টগ্রাম বিশ^বিদ্যালয় শাখার ছাত্র শিবিরের সভাপতি ছিলেন সম্প্রতি গঠিত ‘আমার বাংলাদেশ পার্টি’র (এ.বি পর্টি) সদস্য সচিব এবং মুখপাত্র মুজিবুর রাহমান মঞ্জু।

চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়ের ফিন্যান্স ডিপার্টমেন্টে এমবিএ পড়া মেধাবী সেই ছাত্র এখন দুই সন্তানের জনক। ৬ হাজার টাকা বেতনে অস্থায়ী শিক্ষক হিসেবে শিক্ষকতা করেন কর্ণফুলী পেপার মিল হাইস্কুলের প্রাইমারি সেকশনে।

শিশুদের জাতির জনক বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান ও জননী শেখ হাসিনার গল্প শেখান আজাদ। পড়ান, ‘ব’ তে বঙ্গবন্ধু, ‘ম’ তে মুক্তিযুদ্ধ, ‘জ’ তে জননী আর ‘শ’ তে শেখ হাসিনা! তার সাথে কণ্ঠ মিলিয়ে শিশুরাও সমস্বরে কোরাস তুলে ব-তে ‘বঙ্গ..বন্ধু, ম-তে ‘মুক্তি..যুদ্ধ..’, জ-তে জ..ন..নী আর শ-তে শেখ হা..সি..না!

ট্যাগ :

close