বাংলাদেশ, শনিবার, ২৬ সেপ্টেম্বর ২০২০

কর্ণফুলীকে রাহুগ্রাসমুক্ত করতে হবে

প্রকাশ: ২০২০-০৮-১৭ ২৩:৪৩:৩৮ || আপডেট: ২০২০-০৮-১৭ ২৩:৪৩:৪৪

ওমর ফারুক »

চট্টগ্রামের সুখ-দুঃখ মানেই কর্ণফুলী। এ নদীকে উপজীব্য করেই বন্দর নগরীর উম্মেষ। গড়ে উঠেছে এ নদীর তীরেই শহর, বন্দর ও জনপদ। প্রকৃতির আপন খেয়ালে সাজানো সুপ্রাচীন এ নগরীর বহুবিধ ব্যবসায়িক উপযোগিতা, শিল্প সহায়ক পরিবেশ, প্রাকৃতিক সম্পদ সবকিছুই বাণিজ্যিক ও সামাজিকভাবে অর্থবহ করে তুলেছে কর্ণফুলী নদী। অথচ বিপন্ন এ নদীকে বাঁচানোর কোন উদ্যোগ নেই। নদী তীরবর্তী অবৈধ দখলদারের রাহুগ্রাসে মরতে বসেছে কর্ণফুলী।

৩ হাজার ৫শ’ ফুট উঁচু পর্বত ভারতের আসামের লুসাই পাহাড় থেকে কর্ণফুলীর উৎপত্তি। সেখান থেকে ১৭০ কিলোমিটার আঁকাবাঁকা পথে এসে চট্টগ্রামের পতেঙ্গায় বঙ্গোপসাগরে প্রবেশ করে। স্রোতম্বিনী কর্ণফুলী চট্টগ্রাম নগর এলাকায় বর্তমানে জীর্ণশীর্ণ হয়ে পড়েছে।

কালুঘাট ব্রিজ থেকে পতেঙ্গা নেভাল একাডেমী পর্যন্ত (চট্টগ্রাম বন্দর বাদে) অবৈধ দখলদারের কবলে পড়ে আছে দীর্ঘদিন ধরে। ওই এলাকায় গড়ে উঠেছে বস্তি, দোকানপাট, মিল-কারখানা, সামাজিক ও ধর্মীয় প্রতিষ্ঠানসহ নানা স্থাপনা। পরিবেশবাদী সংগঠন হিউম্যান রাইটস পিস ফর বাংলাদেশ এর হিসেবে নদীর দু’পাশে ২হাজার ১৮১টি অবৈধ স্থাপনা রয়েছে।

সরকারি সংস্থা বাংলাদেশ অভ্যন্তরীণ নৌপরিবহন কর্তৃপক্ষের (বিআইডব্লিউটিএ) এর তথ্য মতে, নদী ও নদীতীরের দখলদারদের মধ্যে ক্ষমতাসীন আওয়ামী লীগ, বিএনপি এবং বিরোধী দল জাতীয় পার্টির প্রভাবশালী ব্যক্তিরাও রয়েছেন। তারা কর্ণফুলী নদী দখল করে বিভিন্ন স্থাপনা, এমনকি শিল্প কারখানা তৈরি করেছে, এমন চিত্রও তারা পেয়েছেন।

কর্ণফুলী নদীতেই একেবারে নদীর ভিতরের জায়গা দখল করে বেশ কয়েকটি ডক ইয়ার্ড, মৎস্য অবতরণ কেন্দ্র করা হয়েছে। নদীটি এভাবেই প্রভাবশালীরা দখলে রেখেছে। বহুবার বিচ্ছিন্নভাবে কর্ণফুলী নদীর অবৈধ দখলের বিরুদ্ধে অভিযান চালানো হয়েছে, কিন্তু সেভাবে কোন লাভ হয়নি।

কর্ণফুলী নদীর গতিপথ স্বাভাবিক রাখতে নদীর সীমানা নির্ধারণ, দখল, ভরাট ও নদীতে যেকোনো ধরনের স্থাপনা নির্মাণ কাজ বন্ধ রাখার জন্য হিউম্যান রাইটস পিস ফর বাংলাদেশের সভাপতি আইনজীবী মনজিল মোরসেদ ২০১০ সালে হাইকোর্টে রিট পিটিশন দাখিল করেন। রিটের শুনানি শেষে ২০১৬ সালের ১৬ আগস্ট কর্ণফুলী নদীর অবৈধ স্থাপনা অপসারণের নির্দেশ দেন হাইকোর্ট।

রায়ের তিন বছর পর ২০১৯ সালের ফেব্রুয়ারিতে কর্ণফুলীতে প্রাণ ফেরাতে অবৈধ স্থাপনা উচ্ছেদ অভিযান শুরু করে চট্টগ্রাম জেলা প্রশাসক। তিন ভাগে ভাগ করে উচ্ছেদ অভিযান প্রথম পর্যায়ের কাজ শেষ করে জেলা প্রশাসন। অভিযানে ২৩০টি অবৈধ স্থাপনা উচ্ছেদ করে ১০ একর জমি উদ্ধার করা হয়। দ্বিতীয় ও তৃতীয় পর্যায়ের কাজ শুরু হওয়ার কথা ছিল। এরমধ্যে তদারকি প্রশাসনকে হুমকি-ধমকি এবং তদবির করা হয় বলে অভিযোগ উঠে, যাতে উচ্ছেদ না করা হয়।

উচ্ছেদ অভিযান পরিদর্শনে গিয়ে ভূমিমন্ত্রী সাফ জানিয়ে দিয়েছিলেন, কোন হুমকি-ধমকি ও তদবিরে কর্ণফুলীকে বাঁচানোর প্রচেষ্টাকে রোধ্য করা যাবে না। চট্টগ্রাম জেলা প্রশাসনও বলেছেন, দখলদারকারীরা যতই প্রভাবশালী হোক না, সব ধরনের অবৈধ স্থাপনা উচ্ছেদ করা হবে। শেষ পর্যন্ত নগরবাসী যা শঙ্কা করেছে তাই হলো। উচ্ছেদ অভিযান বন্ধ হয়ে যায়। গত বছরের ফেব্রুয়ারিতে বন্ধ হয়ে যাওয়া উচ্ছেদ অভিযান প্রশাসন চলতি বছরের ফেব্রুয়ারিতেও শুরু করতে পারেনি। আবার নিরবচ্ছিন্ন নজরদারির অভাবে অবমুক্ত স্থানে আবার গড়ে ওঠেছে অবৈধ স্থাপনা।

২০১৯ সালের ৯ এপ্রিল কর্ণফুলী নদীর তীরে অবৈধভাবে গড়ে ওঠা স্থাপনা অবিলম্বে অপসারণ করতে চট্টগ্রাম বন্দর কর্তৃপক্ষের চেয়ারম্যানকে নির্দেশ দিয়েছিলেন হাইকোর্ট। কিন্তু স্থাপনাগুলো যথাযথ উচ্ছেদ না হওয়ায় এবং আদালতের আদেশ বাস্তবায়ন না করার বিষয় ব্যাখ্যা দিতে গত ৫ জানুয়ারি চট্টগ্রাম বন্দর কর্তৃপক্ষের চেয়ারম্যানকে তলব করে হাইকোর্ট। একই সাথে বন্দর চেয়ারম্যানকে গত ২৬ জানুয়ারি সশরীরে আদালতে হাজির হতে বলা হয়। ওইদিন তিনি কোর্টে হাজির হলে পুনরায় আদালতের নির্দেশ মেনে ৩ মাসের মধ্যে উচ্ছেদ চালাতে সময় বেধে দিয়েছে। আশ্চর্যের খবর হলো- নদ-নদীর দখল রোধে উচ্চ আদালতের দেয়া নির্দেশনা অনেকাংশেই বৃদ্ধাঙ্গুলি দেখাচ্ছে সংশ্লিষ্ট প্রতিষ্ঠানগুলো।

কর্ণফুলীর দু’তীরে বিভিন্ন সময় বিচ্ছন্নভাবে অবৈধ দখলদার বিরুদ্ধে উচ্ছেদ অভিযান হয়েছে। আবার তারা দখল করে স্থাপনা নির্মাণ করেছে। এটা উচ্ছেদ উচ্ছেদ খেলা হয়েছে। অবৈধ দখলের হাত থেকে নদ-নদী, খাল-বিল বা জলাশয় রক্ষায় বিভিন্ন সময় নানান পদক্ষেপের কথা এসেছে। কিন্তু বাস্তবায়ন কতটা হচ্ছে, তা নিয়ে প্রশ্ন থাকছেই।

দেশে নদী রক্ষা কমিশন রয়েছে। বিশেষজ্ঞরা বলছেন, সারাদেশে অবৈধ দখলদাররা প্রভাবশালী এবং তাদের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নিতে জাতীয় নদী রক্ষা কমিশনের ক্ষমতা সীমিত। নদী হত্যা আত্মহত্যার নামান্তরর বলেও মন্তব্য করেছেন হাইকোর্ট।

দেশের সব নদীকে লিগ্যাল পারসন ঘোষণা করে ২০১৯ সালের ৩ ফেব্রুয়ারি এই সংক্রান্ত এক রিটের রায়ে এই পর্যবেক্ষণ দেন। ২৮৩ পৃষ্ঠার পূর্ণাঙ্গ রায়টির ২৭৯ পৃষ্ঠায় আদালত বলেন, ‘নদী দখল ও দূষণকে ফৌজদারি অপরাধ গণ্য করে এর কঠিন সাজাসহ বড় আকারের জরিমানা নির্ধারণ করতে হবে। একইসঙ্গে এই সংক্রান্ত মামলা দায়ের, তদন্ত ও বিচারের পদ্ধতি উল্লেখ করে জাতীয় নদী রক্ষা কমিশন আইন, ২০১৩ এর প্রয়োজনীয় সংশোধনের উদ্যোগ নিতে হবে।

আইনবিদরা বলেছেন, নদী রক্ষা কমিশনের ব্যাপারে ২০১৩ সালে যে আইন করা হয়েছে, তাতে কমিশনের হাতে তেমন কোনো ক্ষমতা দেয়া হয়নি। কমিশন শুধু সুপারিশ করা ছাড়া কিছু বাস্তবায়ন করতে পারে না।

এছাড়া ডিসি, পানি উন্নয়ন বোর্ড, বিআইডাব্লিওটিএ, পরিবেশ অধিদপ্তর এই চারটা দপ্তর নদী দখলের জন্য সম্পূর্ণ দায়ী। এর জন্য তাদেরকে জবাবদিহি করতে হবে। কর্ণফুলী নদী দখলের সঙ্গে জড়িত তারা হয়তো নানাভাবে শক্তিশালী, ক্ষমতা-ঘনিষ্ঠও। তাদের আমল দিলে চলবে না। কর্ণফুলীকে বাঁচাতে হলে জাতীয় স্বার্থকে সব ধরনের ব্যক্তি ও গোষ্ঠীস্বার্থের ঊর্ধ্বে রাখতে হবে। কর্ণফুলী নদীকে স্বাভাবিকভাবে চলতে দিতে হবে।

লেখক : ওমর ফারুক, সাংবাদিক ও প্রাবন্ধিক

ট্যাগ :

close