বাংলাদেশ, মঙ্গলবার, ২৯ সেপ্টেম্বর ২০২০

‘একটি ফরোয়ার্ড মেসেজ’

প্রকাশ: ২০২০-০৯-১৩ ১৭:০৭:০৫ || আপডেট: ২০২০-০৯-১৩ ১৭:০৮:১৪

মঈনুদ্দিন হাসান »

টিং! টিং!

-কে ওখানে?

আমি!

-আমি কে?

জানি না!

-জানি না মানে?

জানি না মানে, জানি না। আরে ভাই সেই সন্ধ্যার আগ থেকে শুরু করে এর ওর ইনবক্সে ঘুরছি! কোথাও একদন্ড শান্তিতে বসতে পারছিনা। এর ইনবক্সে গেলে এ পাঠায় দেয় গলাধাক্কা দিয়া বিশ জনকে, ওর কাছে গেলে সে আবার পাঠায় আরো চল্লিশ জনকে! কি আজব! এত ছড়াচ্ছি যে, আজ নিজেকে ধীরে ধীরে করোনার চেয়েও বেশি শক্তিশালী মনে হচ্ছে। কমিউনিটি সংক্রমন যাকে বলে আরকি, একেবারে সেই অবস্থা!

-অহ আচ্ছা, এতক্ষণে বুঝছি।

ভাই এতক্ষণ পরে এই একমাত্র আপনিই বুঝলেন, আসেন কোলাকুলি করি। কাল না ঈদ!

-আরে রাখো তোমার ঈদ, আসছ, বেশি বকবক না কইরা বইসা থাকো। জিরাও একটু। চা মিষ্টি খাও। দেখি তোমার জমজ ভাই-টাই আসে কিনা! তখন জমিয়ে আড্ডা দিয়া যাইয়ো।

টিং টিং টিং টিং !

-এই তো আইসা গেছে! আচ্ছা, তোমরা তো অনেকের ইনবক্সে ঘুইরা আমার এইখানে আসছো, তো কি কি দেখলা তাগো ইনবক্সে?

ভাই কইয়েন নাহ, এক লোকরে দেখলাম চুপচাপ অনেকগুলো সংস্থায় টাকা পয়সা ডোনেট করতে। দেখে বেশ ভাল্লাগলো। ইনবক্সে প্রচুর মেসেজ জমা হয়েছে এই সেই সংস্থার। অথচ দেইখা মনে হয়নাই উনি অত টাকা পয়সা ওয়ালা লোক! টিনের সেমিপাকা ঘরে থাকে। টেবিলে উপর অনেকগুলো বই দেখলাম। বাচ্চা কাচ্চা আছে মনে হয় দুইটা। টেবিলের উপরে দেয়ালে বাধাই করা ফ্রেমে পাঁচজনের ছবি। বয়স্ক এক মহিলার সাথে বৌ, বেটা, আর দুইটা বাচ্চা। বৌটাকেও দেখলাম ইফতারী বানানো শেষে কপালের ঘাম মুচছে।আর এই লোক তখনো আমায় দেখে কিঞ্চিৎ হেসে আবার নিজের মতো বইপড়ায় লেগে গেলো।

আরেক লোকের ইনবক্সে দেখলাম খালি ক্রেডিট জমা হওয়ার ম্যাসেজ। দেইখা অত সুবিধার মনে হয়নাই। কেমন জানি আদা ব্যাপারি আদা ব্যাপারি টাইপ মনে হইলো। পড়নে সাদা লুঙ্গির সাথে মোচের বাম্পারে বিলি কাটতে কাটতে এটা সেটা অর্ডার দিতাসে।আমি যখন তার ইনবক্সে ঢুকলাম, আমার সাথে তের লক্ষ টাকার আরো দুইটা মেসেজ আসলো। মুখে মুচকি হাসি। আরেকটা ফোন কানে লাগাইয়া খাতুনগঞ্জের এক আরতদাররে কয়, আরো কার কাছ থেইকা নাকি আড়াই পার্সেন্ট কমিশনে সাড়ে ঊনত্রিশ লক্ষ টাকা আসবে, কাল ঈদ, তাই তাড়াতাড়ি যেন পাঠায় দেয়। আমারে দেইখা তেমন পাত্তা দিলো নাহ। একলগে সাত্রিশ জনের ইনবক্সে ধাক্কাইয়া পাঠায় দিলো।

-তার পর আর কি দেখলি??

আরে ভাই, আরেক লোকের ইনবক্সে যাইয়া দেখি আমার মতো কত্তোগুলা পিচ্চি পিচ্চি ছেলেপেলে। ঈদের উছিলায় মনের সুখে বিছানায় এটা সেটা ছড়িয়ে নিয়ে লংকাকান্ড! বেচেরা বাপ মা দুজন তাদের সামাল দিতে না পেরে হাতে মোবাইল দিয়ে বসিয়ে দিয়েছে। এরা মোবাইল নিয়ে শুন্যে ছুড়ে মারছে আর ক্যাচ ক্যাচ খেলছে বিছানায়। আমি তাদের মোবাইলে ঢুকার পর সাড়ে সাত বছরের পিচ্চি মেয়েটা ফ্যালফ্যল কইরা আমার দিকে কিছুক্ষণ চাইয়া থাইকা এক দৌড়ে মার হাতে দিয়া আসলো। বিড়িয়ানির মাংস রান্না হচ্ছে।সুগন্ধি কেউরা জলের আভাস পাচ্ছি। মেয়ের হাত থেকে মোবাইল নিয়ে উনি আমায় দেখে সুইচ অফ করে রেখে দিলো। আমি ঘুমিয়ে গেলাম।

-বলিস কি! তারপর কি হলো?

এর পনেরো কি ষোল মিনিট পর তো নিজেকে একটা হাসপাতালে আবিষ্কার করলাম। গ্লাবস পড়া একটা হাত মোবাইল চেপে নিয়ে আমায় দেখে ভ্রুকুটি করতে দেখলাম।বিরক্ত খুব। ডাক্তারই হবে হয়তো। মাস্কে মুখ নাক ঢাকা হলেও দেখে কচি বয়সের-ই মনে হলো এখনো। চারপাশে পিপিই পরা আরো লোকজন ঘুরছে। বেডে বেডে শ্বাশকষ্টের রোগী। কয়েকজনের মুখে কি সব নল-টল লাগানো দেখলাম। কয়েকটা নিস্তেজ দেহও পরে আছে একপাশে বেডে একটার উপর আরেকটা। অসম্ভব ভয় পেয়ে গেছিলাম। ক্ষনিক পরে বুঝলাম এটা নিশ্চই কোন করোনা ইউনিট।

আমি আশেপাশে তাকাতে গিয়ে চোখে ঝাপসা দেখলাম, বুঝতে বাকী নেই স্যানিটাইজার দিয়ে মোবাইল পরিষ্কার করা হচ্ছে। চোখ খুলে দেখলাম,সারা ঘরময় হাজার-হাজার চাকা চাকা ভাইরাস, আমার দিকে চেয়ে চেয়ে হাসছে, চোখ টিপ্পুনি কাটছে। কিন্তু কেউ পাশে আসলো নাহ। অনেকগুলো মরে পরে আছে স্ক্রিনের উপর। ভাগ্যিস, আমি ফোনের ভেতর থাকি, ইনবক্সে! আযান দিচ্ছে চারপাশে। ডাক্তারবাবু জানালা দিয়ে উঁকি দিলেন।সাথে আমিও। আকাশ দেখা যায় কিঞ্চিৎ এপাশের ওয়ার্ডে। বাহ! নিড়ানির মত বাকা চাঁদ। শাওয়াল মাসের প্রথম চাঁদ! হঠাৎ ডাক্তার ছোকরাটার চোখে ঝিলিক খেলে গেলো। একটু চিন্তা করে খুব দ্রুত একটা নাম্বারে ডায়াল করলো। ওইপাশে ফোন রিসিভ করে একজন গম্ভীর মুখে ফোন তুললেন। ডাক্তার সাহেব ঈদ মোবারক জানিয়ে খুব দ্রুত আমায় পাঠিয়ে দিলেন ওইপাশে। পরে কথা হবে বলে ফোন রেখে দিলেন।

দেড় থেকে দু-মিনিটের মধ্যেই আমি আরেক ইনবক্সে। আর দেখার সুযোগ হলোনা নল-টল লাগানো মানুষ গুলোকে! আর ওইপাশে আমায় দেখে চোখজোড়া ছলছল করে উঠতে দেখলাম। বারবার আমায় দেখছে সে। আর স্ক্রিনে চুমু খেলো কয়েকবার আলতো করে। আমায় পেয়ে গম্ভীর হয়ে থাকা কোন মানুষকে প্রথম এতো খুশি হতে দেখলাম। নিজেরো খুব ভালো লাগছে যে কারো মুখে তো অন্তত হাসি ফুটলো, আমায় ইনবক্সে রেখে নামাজে দাঁড়িয়ে গেলো মেয়েটি।

আমি চুপচাপ ইনবক্সেই পড়ে রইলাম। কিন্তু এর মধ্যেই আমি পুরো স্টোরেজ ঘুরে এসেছি। এই বৈশাখে, তাদের বিয়ে হওয়ার কথা ছিল, গ্যালারীজুড়ে অনেকগুলো এংগেজমেন্টের ছবি। ইসস! কি কিঊট লাগছে দুজনকে! দেখছি, আর ভাবছি মেয়েরা নদীর মতো এতো বহতা কেমনে হয়? আজ হয়তো হাতে মেহেদী পরবে সে, হয়তো কারো অপেক্ষায়, হয়তো খুব পছন্দ করে কেউ এই জিনিসটা, নামাজ শেষ করে এসে সত্যিই মেহেদী নিয়ে বসলো সে। হঠাৎ কি মনে হলো, ফোনটা নিয়ে আমায় দেখলো, আবারো কয়েকটা চুমু দিলো। এর মধ্যে আমার মতো দেখতে আরো সাতান্নটা মেসেজ আনসিন হয়ে আছে। তবুও সে আমায় নিলো। আরও একটি নাম্বারে আমায় সেন্ড করে দিলো। ক্যাপশনে লিখে দিলো, ঈদ মোবারক, আম্মু।

ট্যাগ :

close