বাংলাদেশ, ২১শে জানুয়ারি, ২০২১ খ্রিস্টাব্দ | ৭ই মাঘ, ১৪২৭ বঙ্গাব্দ

মুখ ফিরিয়ে নিয়েছে মা, বেঁচে থাকার যুদ্ধে অবতীর্ণ বাঘ শাবক (ভিডিও)

প্রকাশ:২১শে জানুয়ারি, ২০২১ খ্রিস্টাব্দ

রুবেল  দাশ  »

জন্মের পর মায়ের সান্নিধ্যেই বেড়ে ওঠে একটি শিশু। মায়ের কোলই সেই শিশুর জন্য পরম আরাধ্য স্থান। কিন্তু জন্মের পর যদি সেই শিশুই বঞ্চিত হয় মায়ের স্নেহ থেকে তাহলে সে শিশুর বেঁচে থাকাই হয়ে ওঠে একটি যুদ্ধ। ঠিক এমনটিই ঘটেছে চট্টগ্রাম চিড়িয়াখানায় জন্ম নেয়া নতুন তিনটি বাঘ শাবকের সাথে। জন্মের পর মা বাঘ দূরে ঠেলে দেয়ায় দুধ না পেয়ে দুইটি শাবক ইতিমধ্যে মারা গেছে। আর জীবিত শাবকটি প্রতিনিয়ত বেঁচে থাকার যুদ্ধ চালিয়ে যাচ্ছে।

গত ১৪ই নভেম্বর রাতে চট্টগ্রাম চিড়িয়াখানায় জয়া নামের বাঘিনী তিনটি শাবক জন্ম দেয়। প্রাণীকূলের মধ্যে প্রাকৃতিকভাবেই দেখা যায় সন্তান জন্মদানের পর মা শিশুকে দুধ খাওয়ায় এবং যত্ন নেয়। কিন্তু এই বাঘিনী সন্তান জন্মদানের পর বাচ্চা তিনটিকে দুধ খেতে দেয়নি, কাছেও যাচ্ছে না। ফলে দুধের অভাবে প্রথম শাবকটি মারা যায় ১৫ই নভেম্বর, দ্বিতীয়টি মারা যায় ১৮ই নভেম্বর। চিড়িয়াখানা কর্তৃপক্ষের চেষ্টায় এখন পর্যন্ত বেঁচে আছে নাম না রাখা তৃতীয় শাবকটি। তাকে আলাদা একটি রুমে রাখা হয়েছে নিবিড় পর্যবেক্ষণে। তবে এক মাস না যাওয়ার আগে তার অবস্থা সম্পর্কে কিছুই বলা যাচ্ছে না।

চিড়িয়াখানার ডেপুটি কিউরেটর ও চিকিৎসক শাহাদাৎ হোসেন শুভ জানান, জীবিত শাবকটিকে বাঘের দুধ, ছাগলের দুধ এবং ভিটামিন মিলিয়ে প্রতি চার ঘন্টা পর পর ফিডারে করে দুধ খাওয়ানো হচ্ছে।

তিনি বলেন, মায়ের দুধ না পাওয়ায় শাবকটি অনেক দুর্বল। আমরা সর্বাত্মক চেষ্টা করছি। তবে এক মাস না যাওয়ার আগে কিছুই বলতে পারছি না।

এখন স্বাভাকিভাবেই প্রশ্ন জাগে সন্তানকে কেন দুধ দেয়নি মা বাঘটি? চিড়িয়াখানা কর্তৃপক্ষ বলছে, সন্তানকে দুধ না দেবার ঘটনা বাঘিনীদের জন্য অস্বাভাবিক নয়। বিশেষ করে যেসব বাঘ বন্দি অবস্থায় থাকে, তাদের ক্ষেত্রে এমন হতে পারে। এছাড়া এই বাঘিনীর এটিই প্রথম সন্তান জন্মদান, দুধ না দেয়ার সেটাও একটা কারণ হতে পারে বলে ধারণা করছে চিড়িয়াখানা কর্তৃপক্ষ। প্রথম সন্তান জন্ম দেয়ার পরপর ক্যাপটিভ বা বন্দি অবস্থায় থাকা বাঘিনী অনেক সময়ই খুব উদাসীন আচরণ করতে পারে। সন্তান জন্মের পর পর বাঘিনী সাধারণত যা করে, চিড়িয়াখানায় বন্দি বাঘিনী অনেক সময়ই তা নাও করতে পারে।

জানা যায়, সন্তান জন্মদানের পরপরই সাধারণত বাঘিনী বাচ্চাকে চাটতে শুরু করে, এতে শাবকটির শরীরে রক্ত সঞ্চালন শুরু হয়। এরপর মা তাকে দুধ দেয়, এবং যত্ন নিতে থাকে। জন্মের দুই ঘণ্টার মধ্যে বাচ্চার সাথে থাকা প্লাসেন্টা খেয়ে ফেলে বাঘিনী। এটা তাকে ওই সময় শক্তি যোগায়।

যেহেতু একসঙ্গে একাধিক সন্তান জন্ম দেয় একটি বাঘিনী, ফলে সন্তান জন্মদান প্রক্রিয়ায় সাধারণত ছয় থেকে আট ঘণ্টা সময় লাগে একটি বাঘের। ওই সময়ে চিড়িয়াখানায় থাকা বাঘিনী সাধারণত কর্তৃপক্ষের বা তার পালনকারীর দেয়া খাদ্যগ্রহণ করে না। এমনকি কেউ কাছে ভিড়তে পারে না ওই সময়।

এই মূহুর্তে চট্টগ্রাম চিড়িয়াখানায় মোট ছয়টি বাঘ রয়েছে, এদের মধ্যে দুইটি বাঘ এবং চারটি বাঘিনী রয়েছে।

নাম না রাখা বাঘ শাবকটির মায়ের নাম জয়া। তার জন্মও হয়েছে এই চিড়িয়াখানায়। ২০১৬ সালের ডিসেম্বরে দক্ষিণ আফ্রিকা একটি পুরুষ রয়েল বেঙ্গল টাইগার এবং একটি মেয়ে পুরুষ রয়েল বেঙ্গল টাইগার আনা হয়। ওই সময় বাঘটির নামকরণ করা হয় রাজ এবং বাঘিনীর নাম রাখা হয় পরী।

বাঘটির বয়স সে সময় ছিল ১১ মাস আর বাঘিনীর বয়স ছিল ৯ মাস। ২০১৮ সালের ১৯শে জুলাই পরী নামের বাঘিনী তিনটি সন্তান জন্ম দেয়। ওই তিনটি সন্তানের মধ্যে দুইটি ছিল ‘হোয়াইট টাইগার’, অন্যটি হলুদ-কালো ডোরাকাটা বাঘ, যার নাম রাখা হয় জয়া। সেটি ছিল বাংলাদেশের ইতিহাসে প্রথম কোন হোয়াইট টাইগারের জন্ম, যদি পরে তাদের একটি মারা যায়। বেঁচে থাকা সাদা বাঘিনীর নাম শুভ্রা।

এদিকে, বাঘ শাবকের পাশপাশি এ চিড়িয়াখানায় সাম্বার হরিণ পরিবারেও নতুন একটি শাবকের জন্ম হয়েছে। বাঘ শাবক মায়ের স্নেহ না পেলেও হরিণ শাবকটিকে চোখে চোখে রাখছে মা হরিণ।

পরিবারের অন্য সদস্যদের আদর-স্নেহে বেড়ে উঠছে নতুন শাবকটি। জানা যায়, হরিণ দম্পতি কাজল-লাইলির ঘরে জন্ম নিয়েছে এ শাবকটি। বর্তমানে এ পরিবারে সদস্য সংখ্যা ৬। এরাই বর্তমানে দেশের একমাত্র সাম্বার হরিণ পরিবার। হরিণের এ প্রজাতিটি বিলুপ্তপ্রায় হওয়ায় শুধুমাত্র চট্টগ্রাম চিড়িয়াখানাতেই দেখতে পাওয়া যায় সাম্বার হরিণ।

চিড়িয়াখানার ডেপুটি কিউরেটর ও চিকিৎসক শাহাদাৎ হোসেন শুভ বাংলাধারাকে বলেন, বিরল প্রজাতির সাম্বার হরিণ কাজল-লাইলির ঘরে নতুন একটি শাবক জন্ম নিয়েছে। শাবকটি সুস্থ আছে।

বাংলাধারা/এফএস/এআর

ট্যাগ :

close