বাংলাদেশ, ২রা মার্চ, ২০২১ খ্রিস্টাব্দ | ১৭ই ফাল্গুন, ১৪২৭ বঙ্গাব্দ

এ বসন্তে ভালোবাসারও উপলক্ষ থাকা চাই

প্রকাশ:২রা মার্চ, ২০২১ খ্রিস্টাব্দ

আশরাফুন নুর  »

আজ পহেলা ফাল্গুন ও বিশ্ব ভালবাসা দিবস। প্রতি বছর ফাল্গুনের প্রথম দিন ঋতুরাজ বসন্তকে বরণ করে নেন বাঙালিরা। অন্যদিকে দিনটিকে (১৪ ফেব্রুয়ারি) সারা বিশ্বে ভালোবাসা দিবস হিসেবে পালন করা হয়। বিশ্বে যতগুলো বিশেষ দিবস রয়েছে তার মধ্যে তরুণ-তরুণীদের কাছে এ দিনটি সবচেয়ে প্রিয়। খুব আনন্দ, উৎসবের মধ্য দিয়েই পালন করা হয়ে থাকে এই দিন।

বসন্তের এই দিনে বিনোদন কেন্দ্রগুলো ভালোবাসার মানুষে ভরপুর থাকে। প্রিয়জনকে ফুল ও বিভিন্ন পছন্দের সামগ্রী উপহার দিয়ে থাকে। দিনটিকে ঘিরে বছরজুড়েই প্রেমিক-প্রেমিকারা কল্পনার জগৎ সাজাতে থাকে। সবাই চায় সব ব্যস্ততার পাশ কাটিয়ে এই দিবসে কিছুটা সময় তার প্রিয় মানুষের সথে কাটাতে। দিনটিকে ঘিরে তাদের মধ্যে নানা রকম উপহার, সাজসজ্জার প্রস্তুতি থাকে।

গত বছর বাংলা বর্ষপঞ্জিতে সংশোধনের কারণে বাঙালির বসন্তবরণ তথা ফাল্গুন মাসের প্রথম দিন ও ভালোবাসা দিবস এবারও একই দিনে হচ্ছে। তাই এখন থেকে এই দু’টি দিবসই ১৪ ফেব্রুয়ারি উদযাপন হচ্ছে।

বারবার ফিরে আসে ফাল্গুন, বারবার ফিরে আসে বসন্ত আমাদের জীবনে শোষণ, বঞ্চনা আর আধিপত্য মোকাবিলার দুর্বিনীত সাহস ও অপরিমেয় শক্তি নিয়ে। তাই যেকোনো বিচারে এ এক অনন্য মাস, ঋতু নৈসর্গিক ক্যানভাসে রক্তাক্ত বর্ণমালা যেন এঁকে দেয় অনির্বচনীয় সুন্দর এক আল্পনা।

বসন্তে তরুণীদের পরনে শোভা পায় বাসন্তী রঙের শাড়ি, খোঁপায় বাসন্তী ফুল, গালে বসন্তের মনকাড়া আল্পনা। তরুণদের বসনেও থাকে বাসন্তী ছোঁয়া। এই থেকে বাদ যায় না শিশু কিংবা বয়স্করাও। সবার মন তাই গুনগুনিয়ে গেয়ে বসন্তের গান।

আজ থেকে শুরু হয়ে গেছে বসন্ত ও ভালোবাসার দিবসের উচ্ছ্বাস। ফোন, ফেসবুক, টুইটারসহ বিভিন্ন সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে চলছে বসন্তের শুভেচ্ছা বিনিময়। নানা আয়োজনে বসন্তকে বরণ করবে বাঙালি। গুণ গুণ করে গান করতে তরুণ তরুণীর দল ছুটবে নগরের সিআরবি শিরীষ তলাসহ বিভিন্ন কেন্দ্রে। শুনবে বসন্তের গান, করবে কবিতা পাঠ। কোন এক শিমুল গাছে একটি কোকিল কুহু কুহু রবে ডানা ঝাপটাবে, তার ডানার ছোঁয়ায় ঝরে পড়বে এক থোকা শিমুলগুচ্ছ।

অন্যদিকে বিশ্ব ভালোবাসা দিবসটি যুক্তরাষ্ট্র বা পাশ্চাত্যের মধ্যে সীমাবদ্ধ ছিল একসময়। তবে বর্তমানে বিশ্বব্যাপি আনন্দ-উৎসবের সাথে পালন করা হয়। আমাদের দেশেও একি সাথে আমরা পালন করে আসছি বিশ্বের সাথে তাল মিলিয়ে।

এ ভালোবাসা দিবসের পেছনেও ইতিহাস আছে। এই ইতিহাস নিয়ে নানা মুনির নানা মতও রয়েছে। প্রাচীন রোমে ভ্যালেন্টাইন নামে একজন চিকিৎসক ছিলেন। অসুস্থ মানুষের ওষুধ খেতে কষ্ট হয় বলে তিনি তেঁতো ওষুধ ওয়াইন, দুধ বা মধুতে মিশিয়ে খাওয়াতেন। এ চিকিৎসক খ্রিস্টধর্ম গ্রহণ করেছিলেন। প্রাচীন রোমে খ্রিস্টধর্ম বিশ্বাসীদের শাস্তি দেয়া হতো। একদিন রোমের এক কারা প্রধান তার অন্ধ মেয়েকে চিকিৎসার জন্য ভ্যালেন্টাইনের কাছে নিয়ে আসেন। ভ্যালেন্টাইন তার সাধ্যমতো মেয়েটিকে চিকিৎসা চালিয়ে যাচ্ছেন। এমন সময় হঠাৎ একদিন রোমান সৈন্যরা এসে ভ্যালেন্টাইনকে ধরে নিয়ে যায়। ভ্যালেন্টাইন বুঝে গিয়েছিলেন যে, তাকে মেরে ফেলা হবে একটি কারণে- খ্রিস্টান হওয়ার অপরাধে।

২৬৯ খ্রিস্টাব্দের ১৪ ফেব্রুয়ারি রোম সম্রাট ক্লডিয়াসের আদেশে ভ্যালেন্টাইনের মৃত্যুদণ্ড কার্যকর করা হয়। তার আগে ভ্যালেন্টাইন অন্ধ মেয়েটিকে বিদায় জানিয়ে একটি চিরকুট লিখে রেখে গিয়েছিলেন। তাকে হত্যার পর কারা প্রধান চিরকুটটি দিয়েছিলেন মেয়েটিকে। তাতে লেখা ছিল- ‘ইতি তোমার ভ্যালেন্টাইন’।

ইতোমধ্যে ভ্যালেন্টাইনের চিকিৎসায় মেয়েটির অন্ধ দু’চোখে দৃষ্টি ফিরে এসেছিল। ভালোবাসার এ কীর্তির জন্য ৪৯৪ খ্রিস্টাব্দে পোপ সেন্ট জেলাসিউস ফেব্রুয়ারির ১৪ তারিখকে ভ্যালেন্টাইন্স ডে হিসেবে ঘোষণা করেন। সেই থেকে এই দিনটিকে ভ্যালেন্টাইন্স ডে হিসেবে পালন করে আসছে। ধীরে ধীরে তা সারা বিশ্বব্যাপি জনপ্রিয় হয়ে উঠেছে। বর্তমান বিশ্বের সব দেশেই এ দিবসটি খুব জাকজমকভাবে পালন করে। ভালোবাসা প্রকাশ করে প্রিয় মানুষদের সাথে। ভাল লাগা না লাগা নিয়ে অনেক কিছু শেয়ার করে এইদিনে। প্রিয় মানুষকে কাটায় এই দিনটি।

মা-বাবা, ভাই-বোন, বন্ধু-বান্ধব, স্বামী-স্ত্রী, প্রেমিক-প্রেমিকা যে কোন সম্পর্কের কথা বলি না কেন, সব কিছুর ভিত্তিই হল ভালোবাসা। ভালোবাসা মানে অন্যরকম একটি অনুভূতি যা শুধু হৃদয় দিয়ে অনুভব করা যায়। কেবল ভালোবাসা আছে বলেই আমরা এখনো টিকে আছি এ পৃথিবীতে টিকে আছি। আমাদের মধ্যে প্রতিটি সম্পর্কই ভালোবাসা দিয়ে গড়া।

আমাদের দেশে বছরের অন্যান্য দিবসের মতো ভালোবাসা দিবসও জাকজমকপূর্ণভাবে পালন করে আসছে বেশ কয়েক বছর ধরে। অনেকে ভালোবাসা দিবসটিকে বাণিজ্যিক-বাহ্যিক মনে করে। আসলে এখানে ভালোবাসা দিবসটি উপলক্ষ মাত্র। এই উপলক্ষের কার্যাবলি সারা বছরব্যাপি থাকে- এটাই স্বাভাবিক। তাই ভালোবাসা দিবসকে আড় চোখে তাকানোর কোন কারণ নেই।

সারা বছরই মানুষ ভালোবেসে যায় অথচ তার একটা প্রতীকী দিন থাকবে না, উপলক্ষ থাকবে না- এমন কেন হবে? সবকিছুর উপলক্ষ বা প্রতীক থাকে। ভালোবাসার উপলক্ষও তো থাকা চাই। একটি দিন ভালোবাসার উপলক্ষ হলে ক্ষতি কী?

বাংলা বর্ষপঞ্জি সংস্কার কমিটির সিদ্ধান্ত অনুযায়ী, ১৯৫২ সালের ২১ ফেব্রুয়ারি মাতৃভাষার জন্য আত্মত্যাগের দিনটি ছিল বাংলা বর্ষপঞ্জির ৮ ফাল্গুন। কিন্তু এখন ২১ ফেব্রুয়ারি শহীদ ও আন্তর্জাতিক মাতৃভাষা পালনের দিনটি বাংলা বর্ষপঞ্জির ৯ ফাল্গুন হয়। তাই ২০২০ সাল থেকে শহীদ দিবস ও আন্তর্জতিক মাতৃভাষা দিবস ২১ ফেব্রুয়ারি হবে বাংলা সনের ৮ ফাল্গুন।

১৯৭১ সালের ১৬ ডিসেম্বর ছিল ১ পৌষ। কিন্তু এখন ১৬ ডিসেম্বরের দিন হয় ২ পৌষ। সংস্কারের কারণে এখন থেকে ১৬ ডিসেম্বর হচ্ছে ১ পৌষে।

গ্রেগরিয়ান ক্যালেন্ডারের সঙ্গে বাংলা বর্ষপঞ্জির তারিখগুলোর সমন্বয় করার উদ্দেশে ২০১৫ সালে বাংলা একাডেমির মহাপরিচালক শামসুজ্জামান খানকে সভাপতি করে একটি কমিটি করা হয়। সেই কমিটির সুপারিশ অনুযায়ী এসব সংস্কার আনা হয়।

প্রচ্ছদ ছবি: কমল দাশ

বাংলাধারা/এফএস/এআর

ট্যাগ :

close