বাংলাদেশ, ১৩ই মে, ২০২১ খ্রিস্টাব্দ | ৩০শে বৈশাখ, ১৪২৮ বঙ্গাব্দ

এ জার্নি ফ্রম সোনাপুর

প্রকাশ: বৃহস্পতিবার, ২২ এপ্রিল, ২০২১

আকবর হোসেন রবিন  »

সোনাপুর থেকে বাসের টিকিট কাটলাম, চট্টগ্রাম যাব। আমি সিঙ্গেল মানুষ, পাশের সিট খালি। কাউন্টারে দেখলাম এক ঝাঁক রমণী বসে আছে। ভাবলাম কেউ একজন এসে পাশে বসলে মন্দ হয় না। এসে শুরুতে সংকোচ কাটিয়ে গল্প শুরু করুক কিংবা নানা উচিলায় আমার সঙ্গে কথা বলুক। বাস ঢাকা-চট্টগ্রাম রুটে চলার সময় তার অবাধ্য খোলা চুল উড়ে এসে বারবার আমার মুখের ওপরে পড়ুক। মনে রোমান্টিক একটা ভাব নিয়ে আমাদের দীর্ঘ জার্নি ক্রমেই সংক্ষিপ্ত হতে থাকুক। জেগে জেগে এমন আরও অনেক কিছু ভাবলাম। কিন্তু, গভীর ফ্যান্টাসিতে হারিয়ে যাওয়ার আগে আমার চোখ পড়েছে বাসের গ্লাসে। খেয়াল করলাম লজ্জায় আমার চেহারা পাকা তরমুজের ভেতরের অংশের মতো লাল হয়ে গেছে। তখন নিজেকে দেখে ‘দ্যা জাপানিজ ওয়াইফ’ এর অঙ্কের মাস্টারমশাই স্নেহময়ের কথা মনে পড়লো। দ্রুত মনের গতি পরিবর্তনের জন্য কানে ছেড়ে দিলাম খালিদ হাসান মিলুর ‘সেই মেয়েটি’। গানে গানে কিছুক্ষণের জন্য তন্দ্রায় হারিয়ে গেলাম।

হুশ ফিরলো শাকিব খানের একটা সংলাপ শুনে, সিনেমায় সে বলছে— ‘শাকিব খান আমার ল্যাংটা কালের দোস্ত! আরে অপু বিশ্বাসের সাথে ওর কিচ্ছুই নেই। ও তো নিজেই বিয়ের পাত্রী খুঁজে বেড়াচ্ছে’।

নিজের কানকে বিশ্বাস করতে পারছিলাম না। দ্রুত ইয়ারফোন খুলে আশেপাশে তাকালাম। কিন্তু, বিশ্বাস করেন রাসেল ভাই—এরপর আমি যা দেখলাম তার জন্য একদমই প্রস্তুত ছিলাম না। দেখি পাশের সিটে মধ্যবয়সী এক লোক, মোবাইলে ফুল সাউন্ডে সিনেমা দেখছে, উইথআউট ইয়ারফোন! তার কোলে মাথা রেখে অনেকটা কাত হয়ে দাঁড়িয়ে ঘুমাচ্ছে ৪-৫ বছরের একাট বাচ্চা ছেলে।

ব্যাপারটা এমন হলো—সারারাত স্বপ্নে শুনেছি কোকিলের প্রণয়ী ডাক, ভোরবেলা চোখ খুলে দেখি জানালায় বসে কা কা করছে এফডিসির কাক।

যাই-হোক, এই যে একজন লোক জার্নিতে বসে মোবাইলে ফুল সাউন্ডে সিনেমা দেখছে, এই পুরো ব্যাপারটা শুরুতে আমাকে কিছূটা অবাক করেছে। পরে ভাবলাম এটা তো খুবই দারুণ ব্যাপার। এখনও অন্তত কিছু লোক আছে, যারা জার্নিতে বসে বাংলা সিনেমা দেখে, তাও মোবাইলে। এটা আমাদের সিনেমা ইন্ডাস্টির জন্যও আশার খবর। কোন সাংবাদিক দেখলে হয়তো পত্রিকার বিনোদন পাতায় একটা ফিচারও ছাপা হয়ে যাবে।

ফিচারের কথা ভাবতে না ভাবতেই খেয়াল করলাম পিছনে অত্যাচার শুরু হয়ে গেছে। দুইজন যাত্রী আমার পাশের লোকটাকে উদ্দেশ্য করে কি যেন বলছে। মনে হলো সিনেমার সাউন্ডে তারা খুবই বিরক্ত, তাই মোবাইল অফ করার জন্য অনুরোধ করছে। কিন্তু, পিছনের লোকদের এই কথাগুলো আমার পাশের সিটে বসে থাকা লোকটার কান অবধি পোঁছাচ্ছে না। উনার চোখ এখনও ছোট্ট মোবাইলটার স্ক্রিনে আটকে আছে।

আমি উনাকে একটু করে বললাম—এই যে ভাই, পিছন থেকে দুইজন মানুষ আপনাকে ডাকছে, মনেহয় কিছু বলতে চাচ্ছে। তাকাচ্ছেন না কেন?

এবার একটা মজার ঘটনা ঘটলো—লোকটি আমাকে জবাব দিলো গানে গানে—‘কুছ তো লোগ কহেঙ্গে, লোগোগা কাম হ্যায় কহনা’
‘আরেহ, বাহ্! কিশোর কুমার! নিয়মিত শুনেন?’
‘কী?’
‘কিশোর কুমারের গান।’
‘না। এন্ডু কিশোরের গান হুনি (পড়ুন শুনি)।’
‘তাও বেশ। না মানে, এই মাত্র যে গান গেয়ে জবাব দিলেন তাই ভাবলাম হয়তো আপনার নিয়মিত কিশোর কুমার শোনা হয়।’
‘এগিন তো ছোডবেলাত্তুন হুইনতে হুইনতে বড় হইছি, কে গাইছে হেথাগ্গিন তো জানিনা ভাই।’
‘ওহ্, আচ্ছা।’

আমাদের কথোপকথন আর বেশিদূর এগুলো না, ইতিমধ্যে সিনেমায় গান শুরু হয়েছে। উনার মোবাইলের স্ক্রিনে শাকিব খানের সাথে জয়া আহসানকে নাচতে দেখা যাচ্ছে।

সিনেমা যেমনই হোক না কেন, গান শুরু হলে হুট করে সাউন্ড বেড়ে যায়; মানে খাজনার চেয়ে বাজনা বেশি! এখানেও এমন হলো। খেয়াল করলাম লোকটি এবার সাউন্ড কিছুটা কমিয়ে মোবাইল কানের পাশে এনে ধরে রাখলো। অর্থাৎ সে গান শুনবে, কিন্তু শাকিব-জয়া জুটির পেট দোলানো দেখবে না।

এইদিকে আমিও লোকটির ক্রিয়া-কলাপ আর পর্যবেক্ষণ না করে নিজের কানে ইয়ারফোন গুঁজে দিলাম। প্লেলিস্ট থেকে এক এক করে বাজতে শুরু করলো—আসিফ আকবর, শিরোনামহীন, জগজিত সিং এবং পিংক ফ্লয়েড। এরা একটানে নিয়ে আসলো আমার শহরে। যেখানে আমার মা থাকে, প্রিয়তমা থাকে। ভাইপুত এখন নানার বাড়িতে, রাস্তায় ব্রেক ছাড়া দৌড়াদৌড়ি করে, হাঁটে। গরুর লেজ ধরে টানাটানি করে। রাস্তার পাশে বেঁধে রাখা ছাগলের গলা জরিয়ে ধরে। সে এখন তার জীবনের অন্যতম আনন্দময় দিনগুলো পার করছে, যেখানে গান্ধীজির ছাগল চুরি হয়েছে।

বাংলাধারা/এফএস/এআর

close