বাংলাদেশ, ৮ই ডিসেম্বর, ২০২১ খ্রিস্টাব্দ | ২৩শে অগ্রহায়ণ, ১৪২৮ বঙ্গাব্দ

চট্টগ্রামে বিপজ্জনক মাত্রায় বাড়ছে শব্দ দূষণ

প্রকাশ: বুধবার, ২৪ নভেম্বর, ২০২১

ফাহিম আল সামাদ»

চট্টগ্রাম শহর, যা একসময় মুখরিত ছিল পাখির কলরবে। যার পাহাড়, সমুদ্র, লেক আর প্রকৃতির শ্যামল পরিবেশ যে কাউকে মুগ্ধ করতো। সেই শহরে বর্তমানে পরিকল্পিত নগরায়ণ নামে প্রতিদিনই ঘটছে পরিবেশগত অবক্ষয়। নগরে অন্যান্য দূষণের সঙ্গে পাল্লা দিয়ে বাড়ছে শব্দ দূষণও। গাড়ির হর্নের বিকট শব্দ, কলকারখানার মেশিনের শব্দ, উচ্চ আওয়াজে গান আর উন্নয়ন কর্মকাণ্ডের উচ্চ শব্দে এখন অনেকটাই দুরূহ হয়ে উঠেছে চট্টগ্রাম নগরীতে জনজীবন।

শব্দ দূষণ (নিয়ন্ত্রণ) বিধিমালা, ২০০৬ অনুসারে বিভিন্ন এলাকার জন্য শব্দের মানমাত্রা নির্ধারিত রয়েছে। নীরব এলাকার (হাসপাতাল, স্কুল, কলেজ, বিশ্ববিদ্যালয়, গ্রন্থাগার) জন্যে দিনে ৪৫ ও রাতে ৩৫ ডেসিবল, আবাসিক এলাকার ক্ষেত্রে দিনে ৫০ ও রাতে ৪০ ডেসিবল, মিশ্র এলাকার ক্ষেত্রে দিনে ৬০ ও রাতে ৫০ ডেসিবল, বাণিজ্যিক এলাকার ক্ষেত্রে দিনে ৭০ ও রাতে ৬০ ডেসিবল এবং শিল্প এলাকার জন্য দিনে ৭৫ ও রাতে ৭০ ডেসিবল। অথচ বাস্তব চিত্রে এর কোনোটিই মানা হচ্ছে না। এলাকা ভিত্তিক শব্দের মানমাত্রা নির্ধারণ করা হলেও সেখানে শব্দের পরিমাণ প্রায় দিগুণ লক্ষ্য করা গেছে। সাম্প্রতিক তথ্য বলছে, চট্টগ্রামে নীরব এলাকা হিসেবে ঘোষিত এলাকাগুলোতেও শব্দের মাত্রা নির্ধারিত মানমাত্রার চেয়ে অনেক বেশি।

জানা গেছে, নগরীতে বর্তমানে বাসের শব্দ ৯৫ ডেসিবল, মোটর সাইকেলের শব্দ ৮৭ থেকে ৯০ ডেসিবল এবং কলকারখানার মেশিনের শব্দ ৮০ থেকে ৯০ ডেসিবল। যা বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থা এবং বাংলাদেশ শব্দ দূষণ (নিয়ন্ত্রণ) বিধিমালার নির্ধারিত মানমাত্রার তুলনায় অনেকটাই বেশী।

ফাইল ছবি

সবশেষ ২০২১ সালে চট্টগ্রাম খুলশীস্থ পরিবেশ অধিদফতরের মাসিক শব্দমাত্রা পরিমাপের প্রতিবেদন অনুযায়ী, নগরীর ৩০টি স্থানে শব্দের মানমাত্রা পরিমাপ করে গত ১০ মাসে (জানুয়ারী-অক্টোবর) শব্দের মাত্রা প্রায় প্রতিটি স্থানেই বেশী পাওয়া গেছে। ৩০টি স্থানের মধ্যে ১৫টি নীরব, ২টি মিশ্র, ৭টি আবাসিক এবং ৬টি বাণিজ্যিক এলাকায় শব্দমাত্রা পরিমাপ করা হয়।
প্রতিবেদনে নীরব এলাকা হিসেবে নির্ধারন করা হয়, পাহাড়তলী বালিকা উচ্চ বিদ্যালয় মোড়, ইস্পাহানী পাবলিক স্কুল ও কলেজ মোড়, ইউএসটিসি মোড়, চট্টগ্রাম সরকারী বালিকা উচ্চ বিদ্যালয় এলাকা, বাংলাদেশ মহিলা সমিতি স্কুল এলাকা, ডা. খাস্তগীর সরকারী বালিকা উচ্চ বিদ্যালয় এলাকা, চট্টগ্রাম কলেজ এলাকা, চট্টগ্রাম সিটি কলেজ এলাকা, চট্টগ্রাম মেডিকেল কলেজ এলাকা, চট্টগ্রাম মা ও শিশু মেডিকেল কলেজ, জেমিসন রেড ক্রিসেন্ট হাসপাতাল এলাকা, মমতা ক্লিনিক এলাকা, আল-আমিন হাসপাতাল এলাকা, সার্জিস্কোপ হাসপাতাল এলাকা ও সাদার্ন হাসপাতাল এলাকাকে।

মিশ্র এলাকা হিসেবে নির্ধারন করা হয়, একুশে হাসপাতাল ও ম্যাক্স হাসপাতাল এলাকাকে। আবাসিক এলাকা হিসেবে চান্দগাঁও আ/এ, আমিরবাগ আ/এ, হালিশহর কে ব্লক আ/এ, কল্পলোক আ/এ, হিলভিউ আ/এ, কসমোপলিটন আ/এ ও দক্ষিণ খুলশী আবাসিক এলাকাকে। এবং বাণিজ্যিক এলাকা হিসেবে একে খান মোড়, জিইসি মোড়, বহদ্দারহাট মোড়, আগ্রাবাদ মোড়, সিইপিজেড মোড় ও অক্সিজেন মোড় এলাকাকে নির্ধারন করা হয়।

ফাইল ছবি

বিগত জানুয়ারী মাসে ১৫টি নীরব স্থানের প্রতিবেদন পর্যালোচনায় দেখা যায়, প্রতিটি স্থানেই শব্দের মানমাত্রা অনেক বেশী। যেখানে নির্ধারিত মানমাত্রা ৪৫ ডেসিবল, সেখানে বাস্তবে শব্দের মাত্রা গড়ে ৭০ থেকে ৭৫ ডেসিবল পাওয়া গেছে। একই চিত্র দেখা গেছে ২টি মিশ্র, ৭টি আবাসিক ও ৬টি বাণিজ্যিক এলাকাতেও। সবচেয়ে বেশী দূষণ লক্ষ্য করা গেছে নগরীর জিইসি মোড় এলাকাতে। সেখানে শব্দের প্রাপ্ত মানমাত্রা ছিলো ৯৬.৫ ডেসিবল। যা নির্ধারিত মাত্রার চেয়ে ২৬.৫ ডেসিবল বেশী।

ফেব্রুয়ারী ২০২১ থেকে অক্টোবর ২০২১ পর্যন্ত প্রতিবেদন পর্যালোচনায় দেখা যায়, নীরব, আবাসিক, মিশ্র ও বাণিজ্যিক এলাকা সবকটিতেই শব্দের মানমাত্রা ছিলো অপেক্ষাকৃত বেশী। আবাসিক এলাকাগুলোতে মানমাত্রা ৪৫ ডেসিবল নির্ধারন থাকলেও সরেজমিনে পাওয়া গেছে গড়ে ৫৮ থেকে ৬৯ ডেসিবল। মিশ্র ও বাণিজ্যিক এলাকাগুলোতেও দেখা গেছে একই চিত্র। এসব এলাকার ক্ষেত্রে গড়ে ৭০ থেকে ৭৮ ডেসিবল শব্দমাত্রা পাওয়া গেছে। বরাবরের মতো জিইসি মোড় এলাকা, আগ্রাবাদ মোড় এলাকা, ম্যাক্স হাসপাতাল এলাকা, বাংলাদেশ মহিলা সমিতি স্কুল এলাকা, ইউএসটিসি মোড় ও দক্ষিণ খুলশী আবাসিক এলাকায় শব্দ দূষণের মাত্রা তুলনামূলক বেশী পাওয়া গেছে। তবে গত জুলাই মাসে একুশে হাসপাতাল এলাকা, ম্যাক্স হাসপাতাল এলাকা, সাদার্ন হাসপাতাল এলাকা ও বাণিজ্যিক এলাকাগুলোর শব্দমাত্রা নির্ধারিত মাত্রার নিচে আসলেও পরবর্তী মাসগুলোতে চিত্র আবারও আগের মতো লক্ষ্য করা গেছে।

এর আগে, ২০১৭ সালে পরিবেশ অধিদফতরের তত্ত্বাবধায়নে শব্দ দূষণ নিয়ন্ত্রণে সমন্বিত এবং অংশীদারিত্বমূলক কর্মসূচির আওতায় আটটি বিভাগীয় শহরের শব্দের মাত্রা পরিমাপবিষয়ক জরিপ করা হয়। জরিপে, চট্টগ্রাম শহরের ১০টি নির্বাচিত আবাসিক এলাকা, ১১টি মিশ্র এলাকা, ১১টি বাণিজ্যিক এলাকা, ৭টি নীরব এলাকা ও ২টি শিল্প এলাকায় শব্দ দূষণের মাত্রা দ্বিগুণ এবং কয়েকটি স্থানে তিনগুন পাওয়া যায়। তবে বিগত বছরগুলোতে পরিবেশ অধিদফতরের বিভিন্ন সচেতনতা মূলক কার্যক্রম ও আইন অমান্যকারীদের শাস্তির আওতায় নিয়ে আসায় শব্দ দূষণ নিয়ন্ত্রণের আশা জাগিয়েছে জনমনে।

ফাইল ছবি

চট্টগ্রাম পরিবেশ অধিদফতরের পরিচালক(গবেষণাগার) ইশরাত রেজা বাংলাধারাকে বলেন, ‘আমরা নগরীর বিভিন্ন স্থানগুলোতে প্রতিমাসে পর্যবেক্ষণের মাধ্যমে দূষণের মাত্রা ও কারণ চিহ্নিত করেছি। মূলত মোটরযানের উচ্চ আওয়াজের হর্ন শব্দ দূষণের মূল কারণ হিসেবে দেখা যায়। এছাড়াও কল-কারখানা, নির্মাণ কাজ, মিছিল, সভা-সমাবেশ, ইটভাঙা মেশিন ইত্যাদি কারণে শব্দ দূষণ বৃদ্ধি পাচ্ছে। আমরা সেই এলাকাগুলোতে সচেতনতা কার্যক্রম চালিয়েছি। এছাড়া যারা আইন মেনে চলেনি তাদেরকে শাস্তির আওতায় আনার ব্যবস্থা করেছি।’

২০১৭ সালের জরিপে দেখা যায়, শহরের বিভিন্ন এলাকার হর্ন গণনা করার পর বহদ্দারহাট এলাকাটি হর্ন ব্যবহারের দিক থেকে শীর্ষে। সেখানে ১০ মিনিটে ৬৭২টি হর্ন বাজানো হয় যার মধ্যে ৮৭টি হাইড্রোলিক হর্ন এবং ৫৮৫টি সাধারণ হর্ন বাজানো হয়।
প্রসঙ্গত, ২০০২ সালের ২৭ মার্চ হাইড্রোলিক হর্ন এবং বিকটশব্দ সৃষ্টিকারী যে কোনো ধরনের হর্ন সংযোজনের ব্যাপারে নিষেধাজ্ঞা জারি করে উচ্চ আদালত এবং গাড়িতে বাল্ব হর্ন সংযোজনের নির্দেশ প্রদান করে।

এ প্রসঙ্গে ইসরাত রেজা বলেন, ‘আমরা গত কয়েক মাসে অভিযান পরিচালনা করে বেশ কিছু হাইড্রোলিক হর্ন উদ্ধার ও নষ্ট করেছি। এবং যেসকল চালক হাইড্রোলিক হর্নের ব্যবহার করেছে তাদের শাস্তির আওতায় আনা হচ্ছে। ইতোমধ্যে শহরের দুটি স্থানকে ‘নো হর্ন জোন’ এলাকা হিসেবে ঘোষণা করা হয়েছে। চট্টগ্রাম মেডিকেল কলেজ হাসপাতাল এলাকা ও জামালখানের ডা. খাস্তগীর স্কুল এলাকায় ‘নো হর্ন জোন’ সাইনবোর্ড লাগানো হয়েছে। এছাড়াও শব্দ দূষণের ফলে সৃষ্ট স্বাস্থ্য ঝুঁকি সম্পর্কে চালক ও পথচারীদের মাঝে লিফল্যাট বিতরণ করা হচ্ছে।‘

ফাইল ছবি

তিনি আরও বলেন, ‘শব্দ দূষণে সবচেয়ে বেশী ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছে ছাত্রছাত্রী, শিশু, রোগী, গর্ভবতী, ট্রাফিক পুলিশ এবং পথচারীরা। শিশুদের মানসিক স্বাস্থ্যের উপরেও এর বিরূপ প্রভাব রয়েছে। খুব অল্প বয়সে শ্রবণেন্দ্রিয়র উপর অতিরিক্ত চাপ তাদের শারীরিক স্বাস্থ্যের উপরেও প্রভাব ফেলছে। অন্যদিকে, সাধারণ মানুষের শরীর ও মনের উপরও তীব্র প্রভাব ফেলছে। আমরা নিয়মিত তদারকির মাধ্যমে চেষ্টা করছি ক্রমান্বয়ে এর মাত্রা কমিয়ে আনতে।‘

উল্লেখ্য, শব্দ দূষণ রোধে বাংলাদেশ সরকার শব্দ দূষণ (নিয়ন্ত্রণ) বিধিমালা ২০০৬ প্রণয়ন করে। এছাড়াও বাংলাদেশ পরিবেশ সংরক্ষণ আইন ১৯৯৫, মোটরযান আইন ১৯৮৮, স্থানীয় সরকার (সিটি কর্পোরেশন) আইন ২০০৯, আমদানি নীতি আদেশ ২০১৫-২০১৮ এবং সড়ক পরিবহন আইন ২০১৮-তে শব্দ দূষণে রোধে কয়েকটি আইনে সম্পৃক্ততা রয়েছে। পরিবেশ অধিদফতরের অভিযানে এ সকল আইন অমান্যকারী ব্যক্তিকে শাস্তির আওতায় আনা হচ্ছে এবং অভিযান অব্যাহত রয়েছে।

বাংলাধারা/এফএস/এফএস

ট্যাগ :

close