logo
ফুটপাতের অর্থনীতি
#

মাসুদ মিলাদ »

কারওয়ান বাজারের পাশে ফুটপাতের টং দোকান। চা হাতে নিয়ে মুখ হা করতেই পচে যাওয়া সবজির একপশলা রকমারি বাতাস ঢুকে গেল। ঢাকায় থাকি না বলে হয়তো এদিকটায় পচা সবজির ঘ্রাণ একটু অচেনা ছিল। ফুটপাতে নামহীন এই দোকান আবুল কালামের। এক হাতে চা তুলে দিচ্ছেন, আরেক হাতে সিরামিকের কাপে মরিচারোধী ইস্পাতের চামচ ডুবিয়ে অবিরাম নেড়ে যাচ্ছেন তিনি। এই নাড়ানাড়িতে চায়ের সঙ্গে দুধ মিশে মূল্য সংযোজন হচ্ছে। ভ্যালু বাড়ছে।

চায়ে চুমুক দিতে দিতে আমাদের আড্ডা চলছে। ইফতি ভাই জলবায়ু, কপ, বজ্রপাত নিয়ে জ্ঞানগভীর পাঠ দিচ্ছেন। দুই কান খাড়া করে সুজন, সুজয় চৌধুরী, আব্বাস, রাসেল, মোশারফদের মতো আমিও শুনছি। কঠিন বলে বেশিক্ষণ নিতে পারিনি। আমার নজর কালাম ভাইয়ের টং দোকানে। ফুটপাত দখল করে কালাম ভাই নিজের কর্মের ব্যবস্থাই করেনি, পরিবারের পাঁচ সদস্যের খাবারের যোগান দিয়ে আসছে। সারাদেশে কত হবে? ৫ লাখ, ১০ লাখ দোকান? কোনো হিসাব জানি না। বিবিএসের আছে? যাই হোক, ৫ লাখ হলে ন্যূনতম কর্মসংস্থান ৭–১০ লাখ। এই বিপুল মানুষের কর্মসংস্থানের জন্য সিটি বা মেঘনার মতো ৩৫–৪০টি কোম্পানির দরকার হতো। সরকার করলে এখন যা আছে তার দ্বিগুণ কর্মসংস্থান করতে হবে।

দিনে টার্নওভার (ভ্রু কুঁচকে গেলে বেচাকেনা পড়ুন) কত! কালাম ভাই রয়ে–সয়ে ধারণা দিলেন। দিনে কম করে হলেও ৫ হাজার টাকা বেচাকেনা। গড়ে ২৫০০ নিলাম। তাও সারা দেশে দিনে ১২৫ কোটি টাকা। বছরে প্রায় ৪৫ হাজার কোটি টাকা! ছোট ছোট পুঁজির রুপান্তর কোনো উদ্যোক্তা তৈরি করেছে? জানি না। হতেও পারে। মাসে লাখ টাকা আয় করে এমন ফুটপাতের দোকানদারও আছে, সেটা গোপন থাক। না হলে ভ্যাট–ট্যাক্সের জালে আটকা পড়তে পারেন এমন দু–চারজন।

কালাম ভাইরা ফুটপাত দখল না করলে সেখানে গাড়ি জায়গা দখল করত। কিংবা খালি পড়ে থাকত। শুধু সৌন্দর্যের রুপ থাকত। সেটা দেখে কালাম ভাইদের পেটে খাবার জুটত না। কর্মসংস্থান হত না। ফুটপাতের অনেক কিছু আপনার আমার চোখে অবৈধ হলেও লেনদেনে অবৈধ কিছু নেই। চাকরিজীবী আর শ্রমিকের ঘাম ঝরানো অর্থ খরচ হয় এখানে। যদিও এই সাদা টাকার কিছু অংশ কালো টাকাতে রুপান্তর করেছে চাঁদাবাজেরা। তাও কম না। শুধু ঢাকাতেই নাকি বছরে দুই হাজার কোটি টাকার ওপরে। এসব আবার ডলারে রুপান্তর হয় কি–না জানা নেই।

কালাম ভাই আরেক কাপ চা দিলেন। ভাবতে ভাবতে আট বর্গহাতের দোকানটা একপলক দেখে নিলাম। কাঠের বাকশো। মেড ইন বাংলাদেশ। ছোট্ট মৌলিক আসবাব শিল্পে কর্মসংস্থানের ধাপ পেরিয়ে হয়তো কালাম ভাইয়ের দোকানে ঠাঁই পেয়েছে। একটু দূরে আরেকটিতে দেখলাম ইস্পাতের পাতের বর্গাকার বাকশো। এই পাত কি পিএইচপি না এস আলমের কোল্ড রোল কারখানার? জানি না। পাতের ওপর ৪০ গ্রেডের লোহার রডের স্ট্যান্ড। নিশ্চিত হলাম– বিএসআরএম বা জিপিএইচের না, সনাতন কারখানার। জাহাজভাঙার প্লেট সরাসরি চুল্লীতে নিয়ে রডে বের করে তারা। যাই হোক, কালাম ভাইয়ের দোকানে ফিরি। সেখানে ঝুলছে হরেক রকম বিস্কুট, কেক। ছোট্ট বাকশে বিড়ি–সিগারেট।

কালাম ভাই জানালেন, সিলন–ইস্পাহানির মতো ব্র্যান্ডের চা ব্যবহার করেন তিনি। খোলা চিনি বলে সেটা কার তা জানা গেল না। ঢাকায় বলে হয় সিটি বা মেঘনারই হবে। আছেই তো চারটা। বিড়ির তালিকায় আবুল খায়ের, ব্রিটিশ আমেরিকান টোবাকো বা জাপান টোবাকোর। যে বিস্কুট–কেক দেখা গেল তাও ছোট–বড় শিল্পগ্রুপের। চা দেশেই হয়। চারটি স্টারলিং কোম্পানি এবং দেশের ১৮টি শিল্পগ্রুপের বাগানের চা–নিশ্চিত বলা যায়। এই চা প্যাকেটজাত হয়ে ঘুরে আসছে সেই আবুল খায়ের, ইস্পাহানি বা মেঘনার হাত ধরে।

তার মানে কালাম ভাই বাংলাদেশের কনগ্লোমারেটদের ব্যবসা সচল রাখছেন। আপনাদের বিশ্বাস হয় না? তাহলে করোনার সময় ফুটপাতের দোকান বন্ধ বলে তাদের চেহারায় চিন্তার ভাজ কেন পড়ল। কেন ফুটপাতের ব্যবসা টিকিয়ে রাখতে করোনায় কাগজের কাপ বিলি করল বড়রা। কেন বড় বড় ব্র্যান্ডগুলো ফুটপাতের জন্য চুপি চুপি গুঁড়োদুধ–চায়ের আলাদা ব্র্যান্ড বাজারে ছাড়ল? কনডেন্সড মিল্ক শিল্প সচল রাখতে কেন ফুটপাতের বেচাকেনার বেশি হিসাব নেন তারা?

কালাম ভাই যা বিক্রি করছেন তা এদেশের কনগ্লোমারেটরা বানালেও কাঁচামাল আসছে দূরদেশ থেকে। চিরচেনা এশিয়ার কথা না বলি। ইউরোপ-আমেরিকার কোনো না কোনো দেশ থেকে আসছে এসব কাঁচামাল। কৃষিপণ্য এনে মাড়াই বা শোধন করে তা বাজারজাত করছে বড় বড় গ্রুপগুলো। আপনি চায়ে বিস্কুট চুবানোর সঙ্গে কানাডার কৃষকের লভ্যাংশ পরিপূর্ণ হয়। চাষের আওতা বাড়ান।

আপনি আমি খাচ্ছি বলেই পুতিন-জেলেনেস্কির শক্তি অনেক বেড়েছে। যুদ্ধ থামছে না। একইভাবে আর্চার, লুইস ড্রাইফাস, ভুঙ্গি কিংবা মিনাসোটার কার্গিল বাংলা ভাষায় বিশ্বসেরা চার দালাল হয়েও সাপ্লাইয়ার্সের খেতাব লুফে নিচ্ছে। শুধু খাতুনগঞ্জের সফট কমোডিটির ব্রোকার শুনলে আপনার ভ্রু কুঁচকে উঠে। বছরে হাজার হাজার কোটি টাকা তাদের হাত ধরে লেনদেন হলেও আপনি তা বন্ধ করে প্যাকেটজাতের নামে বড় কোম্পানিগুলোর হাতে সব তুলে দিতে চান। অথচ আপনার–আমার চাহিদা মেটাতে হয় বলে এ দেশের বড়রা ফুলেফেপে ওঠতে ওঠতে ইউক্রেনে গম রাখার আস্ত সাইলো কিনে ফেলেছে।

পুতিন বা কার্গিলের কথা বাদই দিলাম। খাতুনগঞ্জের অলিগলি বা সিটি–মেঘনার কারখানায় বিদেশি দূতাবাসের কর্মকর্তাদের পরিদর্শনের খবরই তো দেখেন প্রায়। পরিদর্শনের আড়ালে তারা যাচ্ছেন নিজ দেশের পণ্য বেচাবিক্রিতে শান দিতে। কয়দিন আগে শুনলাম পণ্য বেচতে ঢাকায় মেলাও করেছে যুক্তরাষ্ট্র। বাকি আছে শুধু ফুটপাত। ক্ষুদ্র ঋণ বা স্কুল টিফিনের টাকার ব্যবহারের মতো ফুটপাত নিয়ে গবেষণা হলে এটাও আর বাকি থাকবে না। তখন হয়তো চায়ে চুবিয়ে বিস্কুট খাওয়া বা সয়াবিন তেলে ডুবিয়ে সিঙ্গারা ভেজে খাওয়ার তত্ত্ব আসবে। তাতে সয়াবীজ, গমের ব্যবসা ভালো হবে। মানে আপনি ফুটপাতে চা–বিস্কুট খেয়ে শুধু দেশের না বিদেশের অর্থনীতিতেও ক্ষুদ্রমাংশ অবদান রাখছেন।

কথা বলা আর ভাবনায় পাঁচ–ছয় কাপ চা হয়ে গেল। বিশ্বের সেরা চা খোর তুরস্কের গড় চা পানের চেয়ে বেশি। চট্টগ্রামের গাড়ি ধরতে হবে।

লেখক : জ্যেষ্ঠ প্রতিবেদক, প্রথম আলো
(লেখা ফেইসবুক থেকে সংগ্রহীত)