গণপ্রজাতন্ত্রী বাংলাদেশ সরকার নিবন্ধিত। রেজি নং-০৯২

রেজিঃ নং-০৯২

ডিসেম্বর ১, ২০২২ ৩:৩০ অপরাহ্ণ

বৈশ্বিক মন্দা সত্ত্বেও বাংলাদেশের অর্থনীতি সচল রয়েছে : প্রধানমন্ত্রী

মিরসরাই প্রতিনিধি »

প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা বলেছেন, রাশিয়া-ইউক্রেন যুদ্ধের কারণে বিশ্বে অর্থনীতি মন্দা পরিস্থিতিতেও বাংলাদেশের অর্থনীতি সচল রয়েছে। বিশ্বে বাংলাদেশ উন্নয়নশীল দেশের মর্যাদা লাভ করেছে। দেশ অনেক বদলেছে, নির্বিঘ্নে চলছে দেশের উন্নয়ন কর্মযজ্ঞ। এখন আর ‘হাওয়া’ ভবন নেই। উন্নয়ন করতে হলে এখন আর কোথাও টাকা দিতে হয়। ব্যবসায়িরাও ইচ্ছেমত বিনিয়োগ করতে পারছেন।

রবিবার (২০ নভেম্বর) সকালে স্বাধীনতার সুবর্ণজন্তী ও জাতির পিতা বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের জন্মশতবার্ষিকী উপলক্ষে সারাদেশের অর্থনৈতিক অঞ্চলে (ইজেড) ৫০টি শিল্প ইউনিট, প্রকল্প ও সুযোগ-সুবিধা উদ্বোধনকালে তিনি এ কথা বলেন। গণভবন থেকে ভার্চুয়ালি উদ্বোধন অনুষ্ঠানে যুক্ত হন সরকার প্রধান। ৫০টি শিল্প ইউনিট ও অবকাঠামোর উদ্বোধন এবং ভিত্তিপ্রস্তর স্থাপন করতে গিয়ে আজ আমি খুবই আনন্দিত। প্রধানমন্ত্রী ৪টি ক্যাটেগরিতে মোট ৫৩টি ফলক উন্মোচনের মাধ্যমে এ উদ্বোধন ঘোষণা করেন।

প্রধানমন্ত্রী বলেন, যাদের চোখ আছে তারা দেশের এই উন্নয়নের চিত্র দেখছেন। বৈশ্বিক মন্দাতেও বাংলাদেশ খারাপ নেই। এমন সময়েও দেশে নতুন নতুন শিল্পায়ন হচ্ছে। বর্তমান সরকারের ক্রমাগত প্রচেষ্টার ফলে উন্নয়নশীল দেশের মর্যাদা পেয়েছে বাংলাদেশ। তিনি বলেন, জাতির পিতা বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান দেশে শিল্পায়নের স্বপ্ন দেখেছিলেন এবং বঙ্গবন্ধু যখন যুক্ত ফ্রন্ট সরকারের শ্রম, বাণিজ্য ও শিল্প মন্ত্রী ছিলেন, সেসময় ১৯৫৭ সালের ১৪ই মার্চ বিসিক আইন প্রণয়নের মাধ্যমে বিসিক প্রতিষ্ঠিত হয় এবং বাংলাদেশে শিল্পায়নের প্রথম সোপান রচিত হয়।

নিজেদের প্রজ্ঞা, মেধা, মনন আর স্বকীয়তাকে কাজে লাগিয়ে দেশ ও জাতির বৃহত্তর উন্নয়নে অংশীদার হওয়ার জন্য নিজেকে তৈরী করতে প্রধানমন্ত্রী সবাইকে আহ্বান জানান।

বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিব শিল্প নগরে প্রথমবারের মতো ৪টি প্রতিষ্ঠান বাণিজ্যিক উৎপাদন শুরু করায় সংশ্লিষ্ট সকলকে অভিনন্দন জানান এবং সাফল্যের এই ধারাকে অব্যাহত রাখার জন্য সকল বিনিয়োগকারীর প্রতি আহ্বান জানান।

তিনি বলেন, অর্থনৈতিক অঞ্চল প্রতিষ্ঠার ক্ষেত্রে তাঁর সরকার সরকারি খাস, পতিত জমি এবং চরাঞ্চলকে প্রাধান্য দিচ্ছে।

তিনি উল্লেখ করেন, অর্থনৈতিক অঞ্চল প্রতিষ্ঠায় সংশ্লিষ্ট এলাকার জনসাধারণের সর্বোচ্চ কল্যাণের বিষয়টি বিবেচনায় রাখার জন্য সংশ্লিষ্ট সকলকে তিনি নির্দেশনা দিয়েছেন। এতে সাধারণ মানুষের জীবন ও জীবিকার উন্নয়ন হবে এবং জাতীয় অর্থনীতির পাশাপাশি গ্রামীণ অর্থনীতিও সমৃদ্ধ হবে।

তিনি আরও বলেন, বাংলাদেশ অর্থনৈতিক অঞ্চল কর্তৃপক্ষ ইতোমধ্যে দক্ষতা উন্নয়নের সাথে সম্পৃক্ত বিভিন্ন প্রতিষ্ঠানের সাথে সমন্বয়ের কাজ শুরু করেছে। এ লক্ষে ক্ষতিগ্রস্থ ও কর্মহীন মানুষের জন্য চাহিদাভিত্তিক কারিগরী ও অন্যান্য প্রশিক্ষণের জন্য কেন্দ্র স্থাপন করছেন।

প্রধানমন্ত্রী আশা করেন, বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিব শিল্পনগরের পূর্ণাঙ্গ বাস্তবায়নের মাধ্যমে সেখানে কয়েক লক্ষ মানুষের কর্মসংস্থান সম্ভব হবে। তিনি জানান, অর্থনৈতিক অঞ্চলসমুহে ইতোমধ্যে প্রায় ৪৫ হাজার কর্মসংস্থানের সৃষ্টি হয়েছে। শেখ হাসিনা বলেন, নারী উদ্যোক্তাদের জন্য প্রত্যেক সরকারি অর্থনৈতিক অঞ্চলে যথেষ্ঠ পরিমাণে জমি বরাদ্দ রাখা হবে যাতে তাঁরা সেখানে শিল্প স্থাপন করতে পারেন।

তিনি বলেন, বঙ্গবন্ধু একটি যুদ্ধবিদ্ধস্ত দেশকে যখন অর্থনৈতিকভাবে এগিয়ে নিয়ে যাচ্ছে ঠিক তখনি ঘাতকেরা আমার পিতা-মাতা সহ পরিবারের সকলকে হত্যা করে। আমি ও আমার বোন রেহানা তখন দেশের বাইরে থাকার কারণে বেঁচে যাই। তবে ৬ মাস দেশের বাইরে রিপোজি হিসেবে থাকতে হয়েছে। দীর্ঘ ২১ বছর পরে ক্ষমতায় আসার পর দেশের উন্নয়ন অগ্রযাত্রা শুরু করেছি। কিন্তু ২০০১ সালে বিএনপি-জামায়াত ক্ষমতায় আসার পর আবার দেশ পিছিয়ে গেছে। ২০০৮ সালে আওয়ামী লীগ ক্ষমতায় আসার পর এবং টানা তিনবার ক্ষমতায় থাকার কারণে দেশের উন্নয়ন চিত্র পাল্টে গেছে। তিনি বলেন, শিল্প স্থাপনের ফলে যাতে পরিবেশের উপর বিরূপ প্রভাব না পড়ে সে জন্য অর্থনৈতিক অঞ্চলে পরিবেশবান্ধব শিল্পাঞ্চলের উপর বিশেষ গুরুত্ব প্রদান করে মাননীয় প্রধানমন্ত্রী বলেন, অর্থনৈতিক অঞ্চলগুলোতে লেক, জলাধার, কেন্দ্রীয় বর্জ্য শোধনাগার ব্যবস্থার ওপর অত্যন্ত গুরুত্ব প্রদান করা হচ্ছে।

তিনি আরও বলেন, প্রতিটি সরকারী ও বেসরকারী অর্থনৈতিক অঞ্চলে বৃষ্টির পানি সংরণাগার, পানি শোধনাগারসহ আধুনিক সকল সুবিধা যাতে বাস্তবায়ন করা যায় সে ব্যাপারে সজাগ দৃষ্টি রাখা হবে।

অনুষ্ঠানে ভূমি মন্ত্রী ভূমি মন্ত্রণালয়কে বেজার স্বপ্ন যাত্রার গর্বিত অংশীদার হিসেবে উল্লেখ করে বলেন, বেজা অনুর্বর/পতিত জমিকে কার্যকরীভাবে ব্যবহারে লক্ষে শিল্পায়নের জন্য ভূমি ব্যাংক তৈরী করে অনন্য দৃষ্টান্ত স্থাপন করেছে।
প্রধানমন্ত্রী আরও বলেন, সরকার মোট একশোটি শিল্প নগর করছে। এসব শিল্প নগরে ১ কোটি মানুষের কর্মসংস্থান হবে। ২৫ বিলিয়ন মার্কিন ডলারের বেশী বিনিয়োগ হবে।

ভিডিও কনফারেন্সের মাধ্যমে আনুষ্ঠানিকভাবে উদ্বোধন করা হয়েছে চার শিল্প প্রতিষ্ঠানের বাণিজ্যিক উৎপাদন কার্যক্রম। প্রতিষ্ঠানগুলো হলো ভারতের এশিয়ান পেইন্টস, জাপানের নিপ্পন, বাংলাদেশ ম্যাকডোনান্ড ও টিকে গ্রুপের সহযোগী প্রতিষ্ঠান সামুদা কনস্ট্রাকশন লিমিটেড। এসময় প্রশাসনিক ভবন, ২০ কিলোমিটার শেখ হাসিনা সরণি, ২৩০ কেভিএ গ্রিডলাইন ও সাবস্টেশনও উদ্বোধন করা হয়েছে।

ভিত্তিপ্রস্তর স্থাপন করা প্রতিষ্ঠানগুলো গুলো হলো বসুন্ধরা কেমিক্যাল ইন্ডাস্ট্রিজ লিমিটেড, বসুন্ধরা প্রিফেব্রিকেটেড বিল্ডিং ম্যানুফ্যাকচারিং লিমিটেড, বসুন্ধরা মাল্টি স্টিল ইন্ডাস্ট্রিজ লিমিটেড, ম্যারিকো বাংলাদেশ লিমিটেড, কিয়াম মেটাল লিমিটেড, এসকিউ ইলেকট্রনিক্স লিমিটেড, সামুদা ফুড প্রোডাক্ট লিমিটেড ও বেজার পানি শোধানাগার প্লান্ট।

জানা গছে, স্বাধীনতার ৫০ বছর পূর্তি উপলক্ষে বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিব শিল্প নগরে (বিএসএমএসএন) এর প্রশাসনিক ভবন, ২০ কিলোমিটার শেখ হাসিনা সরণি, ২৩০ কেভিএ গ্রিডলাইন ও সাবস্টেশন, ভারতের এশিয়ান পেইন্টস, জাপানের নিপ্পন, বাংলাদেশ ম্যাকডোনাল্ড ও টিকে গ্রুপের সহযোগী প্রতিষ্ঠান সামুদা কনস্ট্রাকশন লিমিটেডের বাণিজ্যিক কার্যক্রম উদ্বোধন করা হয়। বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিব শিল্প নগরে (মিরসরাই-সীতাকুন্ড-ফেনী অর্থনৈতিক অঞ্চল) এপর্যন্ত ৫ হাজার ৪৩ একর জমিতে ১৩৬ টি প্রতিষ্ঠান ১৭,৮৩৯ মিলিয়ন ডলার বিনিয়োগ করেছে। যেখানে প্রায় ৭ লাখ ৫২ হাজার ৫৯৩ জনের কর্মসংস্থানের লক্ষ্যমাত্রা নির্ধারণ করা হয়েছে।

এই শিল্প ইউনিটগুলোতে ইতোমধ্যে ৯৬৭.৭৩ মিলিয়ন মার্কিন ডলারের বেশি বিনিয়োগ হয়েছে এবং আরও প্রায় ৩৩১.২৭ মিলিয়ন ডলার বিনিয়োগ করবে।

বেজার তথ্য মতে, বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিব শিল্প নগরের ৩০ হাজার একর জমির মধ্যে প্রায় ৬ হাজার একর জমি শিল্পকারখানা গড়ে তোলার উপযোগী করা হচ্ছে। অন্যান্য অবকাঠামো উন্নয়নের কাজ চলছে। বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিব শিল্পনগর সর্ববৃহৎ এবং বহুমাত্রিক বৈশিষ্ট্যসম্পন্ন। দক্ষিণ এশিয়ার অন্যতম বৃহৎ অর্থনৈতিক ও শিল্পজোন। দেশের দক্ষিণ-পূর্বাঞ্চলের প্রবেশদ্বারে দেশি-বিদেশি বিনিয়োগ, শিল্পায়ন ও অর্থনীতির এক মহাজংশন। করোনাবাধা-বিপত্তি ডিঙিয়ে এ মুহূতের্¦ অবকাঠামো সুযোগ-সুবিধা ও উন্নয়নের মোহনায় দাঁড়িয়ে। জোরদার গতিতে এগিয়ে চলেছে অবকাঠামো উন্নয়ন। সেই সঙ্গে বিনিয়োগ ও শিল্প-কারখানা স্থাপনের প্রক্রিয়া। ইতোমধ্যে এই ৬ হাজার একর জায়গাজুড়ে রাস্তা, ব্রিজ, বিদ্যুৎ, গ্যাস সুবিধা নিশ্চিত করা হয়েছে। বঙ্গবন্ধু শিল্প নগরে ৫০০ একর জায়গায় গড়ে উঠছে গার্মেন্টস ভিলেজ। ১ হাজার ১৫০ একর জমিতে গড়ে উঠছে বেপজা অর্থনৈতিক অঞ্চল; এছাড়াও ৫০০ একর বসুন্ধরা গ্রুপকে এবং ৫০০ একর এসবিজি ইকোনোমিক জোন প্রতিষ্ঠার জন্য জমি বরাদ্দ দেওয়া হয়েছে। সেখানে চলেছে অবকাঠামোগত উন্নয়নের কাজ। এছাড়া ৪০ একর জমিতে হেলথ কেয়ার, ১০০ একর জমিতে বাংলাদেশ অটো ইন্ডাস্ট্রিজ, ৪০ একর জমিতে এসকিউ ক্যাবল, ১০ একর জমিতে চীনের জিং জিয়ান, ২০ একর জমিতে মডার্ন সিনটেক্স এবং ১০০ একর জমিতে নিপ্পন ও ম্যাকডোনাল্ড সহ কয়েকটি কারখানার কাজ চলছে।

বেজার নির্বাহী চেয়ারম্যান শেখ ইউসুফ হারুনের স্বাগত বক্তব্যের মধ্য দিয়ে ফেনী, মিরসরাই ও সীতাকুন্ডের দেশের সর্ববৃহত শিল্প নগরে আয়োজিত অনুষ্ঠানে আরও বক্তব্য রাখেন, চট্টগ্রাম-১ আসনের সংসদ সদস্য ইঞ্জিনিয়ার মোশাররফ হোসেন, প্রানমন্ত্রীর বেসরকারি শিল্প ও বিনিয়োগ উপদেষ্টা সালমান ফজলুর রহমান, ভূমি মন্ত্রী সাইফুজ্জামান চৌধুরী জাবেদ ও বসুন্ধরা গ্রুপের ভাইস চেয়ারম্যান সাফওয়ান সোবহান। এসময় উপস্থিত ছিলেন চট্টগ্রামের জেলা প্রশাসক মমিনুর রহমান, মিরসরাই উপজেলা পরিষদের চেয়ারম্যান আলহাজ্ব জসীম উদ্দিন, মিরসরাই উপজেলা নির্বাহী অফিসার মিনহাজুর রহমান সহ জনপ্রতিনিধি, প্রশাসনিক কর্মকর্তাবৃন্দ।

Share on facebook
Facebook
Share on twitter
Twitter
Share on linkedin
LinkedIn
Share on whatsapp
WhatsApp
Share on telegram
Telegram
Share on skype
Skype
Share on email
Email

আরও পড়ুন

অফিশিয়াল ফেসবুক

অফিশিয়াল ইউটিউব

YouTube player